হাঁটা এক ধরনের নেশা। হাঁটতে থাকলে তখন কেবল হাঁটতেই হয়, গাড়িতে চড়তে ইচ্ছে করে না। কোনো প্রাপ্তি নেই, কোনো সহযাত্রী নেই, শুধু গন্তব্য আছে জেনে হাঁটতে থাকি।
প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার পথে আমি গড়পড়তা চার কিলোমিটার হাঁটি। গাড়ির হর্ন, ব্রেক ঘষার শব্দ, রিকশা-অটোর তুরন্ত গতায়াত, মানুষের ভীড়ের কলরব, ছাত্রছাত্রীদের নিরানন্দ স্কুলগমন ভেদ করে আমি কুমকুম রোদ মাথায় করে হাঁটি। হাঁটার আনন্দ নিয়ে হাঁটি। যেমন জীবন। জীবনকে যাপন করতে হয় বলে জীবন এত সুন্দর, এত অলৌকিক। যেমন নদী। বয়ে চলা আছে বলে তার নাম ময়ূরাক্ষী। নইলে তার নাম হতো বালুচর।
ঢাকা শহরে হাঁটা খুব মজাদার। প্রতি পদক্ষেপে মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। নতুন একটা মুখ চেনা হয়। নতুন কৌতূহল নিয়ে তাকাই। চিন্তা করেন একবার, আপনি হাঁটছেন সুইজারল্যান্ডের শহরতলী দিয়ে। মানুষের মুখের দেখা পাবেন কালেভদ্রে। যাত্রাপথে কোনো কৌতূহল নেই। কোনো নতুনত্ব নেই। আপনার হাঁটতে তখন বিপন্ন বোধ হবে। নিছক সৌন্দর্য দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্তিকর। কেবল সৌন্দর্যের মোহ কেটে গেলে প্রেমও তো মরে যায়।
যেমন জীবনানন্দ দাশ বলেন:
আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন—কতদিন আমিও তােমাকে
খুঁজি নাকো,
এক নক্ষত্রের নিচে তবু—একই আলাে পৃথিবীর পারে
আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনাে পথের রেখা হ’য়ে যায় ক্ষয়,
প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়,
হয় নাকি?’
—ব’লে সে তাকাল তার সঙ্গিনীর দিকে;
আজ এই মাঠ সূর্য সহধর্মী অঘ্রাণ কার্তিকে
প্রাণ তার ভ’রে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.