আমার দাদা ছিলেন পাটের বেপারী। বিরাট বেপারী না, এলাকার লোকাল বেপারী। মৌসুমে গ্রামে গ্রামে পাট কিনতেন, দরদাম বুঝে হাটবারে বিক্রি করে দিতেন। কখনো দাম পড়তির দিকে থাকলে মণকে মণ পাট এনে রেখে দিতেন আমাদের বাংলাঘরে (কাছারি)। আমরা সেই পাটের টালের উপরে ওঠে খেলায় মাততাম, অনেক সময় কুস্তিও।

আমার শৈশবে পাটের দখল বেশ জোরালো। পাটের বেপারী দাদা তো ছিলেনই, তিনি বেশ রকমের গেরস্তও ছিলেন। নিজে কয়েক বিঘা জমিতে পাট বুনতেন। তাছাড়া ওই সময়টাতে গ্রামের আকছার গেরস্তই পাটচাষের জিম্মাদার ছিলেন। ফলে আষাঢ়-শ্রাবণ থেকে ভাদ্র আর আশ্বিনের গোড়া পর্যন্ত পাটের সঙ্গে আমার ছিল দহরম মহরম।

আষাঢ় মাস থেকে শুরু হতো পাটের আখের গুছানো। প্রথমে ক্ষেত থেকে পাট কাটা। পাট কেটে আঁটি বেঁধে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হতো বিলের খানিকটা গভীর জলে, যেখানে কোমর সমান থেকে বেশি জলের গভীরতা। ওই সমান জলে দিতে হতো পাটের জাগ। ‘জাগ’ বলতে কাটা পাটের বোঝা পানির নিচে চুবিয়ে রাখা। পাট পানির নিচে রাখতে বোঝার উপরে দিতে হতো এন্তার জলজ আগাছা আর কাদামাটি, তবেই সেগুলো জলের তলায় ডুবে থাকবে। জলে ডুবে না থাকলে পাট পচবে কীভাবে? কাঁচা পাট পচলে তবেই না সেগুলো হবে সোনালী আঁশ।

জলের নিচে পাটের জাগ রাখতে হতো ১৫-২০ দিন। অতদিনে কাঁচা পাটের আঁশ নরম হয়ে খড়ি থেকে আলাদা হতে শুরু করে। এবার সেগুলো ছড়ানোর কর্মযজ্ঞ। ছোটকালের ওই সময়ে পাট ম্যানুফাকচারিংয়ের কোনো কাজেই তো আর মাহের ছিলাম না, তাই দাদা-চাচাদের সঙ্গে সব কাজেই হাত লাগাতাম। পাট কাটা থেকে জাগ দেওয়া, জাগ থেকে পচা পাটের আঁটি উঠানো, এবং খড়ি থেকে আঁশ আলাদা করা—এই সব কাজেই কম-বেশি হাতসাফাইয়ের অভিজ্ঞতা আছে। মুফতে বিলের জলে পা ডুবানোর খেসারত দিতে হতো পাইনাপোকার কামড় খেয়ে। সারা শরীর চাকা চাকা হয়ে যেত। আর সে কি চুলকানি। রসুন দিয়ে গরম সরিষার তেল না মাখানো পর্যন্ত নিস্তার নেই।

পরবর্তী কাজ ছিল পাটের খড়ি থেকে আঁশ ছড়ানো। এই কাজ দুই তরিকায় সম্পাদন করা হতো। হয়তো পুরুষ কামলা-রাখালেরা পানিতে দাঁড়িয়ে খড়ি থেকে আঁশ ছড়াতেন; নয়তো গ্রামের নারীরা খড়ি করায়ত্ত করার বিনিময়ে কাজটা করতেন।

পাটের সবচে মনোহর যে দৃশ্য হৃদয়ের আরশিপটে সাঁটা, সেটা নারীদের এই আঁশ ছড়ানোর দৃশ্য। রাস্তার দু’ধারে বসে গ্রামের নারীরা পাট থেকে আঁশ ছড়াচ্ছেন। এক হাতে পাটখড়ি, আরেক হাতে আঁশগুলো ছড়িয়ে ‘হাতা’ বেঁধে রাখছেন পাশে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা, তাদের সামনে জড়ো হচ্ছে ভেজা পাটখড়ি। দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল হই হই করছে, নারীরা খড়িগুলো আঁটি বেঁধে ‘কাড়ি’ করে রাখতেন, অনেকটা ত্রিভূজ আকৃতির শেপ দিয়ে রাস্তার পাশে সারি সারি খড়ির কাড়ি। দিনমান পরিশ্রমের শেষে তাদের উপার্জন এই পাটখড়ি। দিন কয়েক রোদে শুকালে খড়িগুলো নিয়ে আসতেন বাড়ি। এই খড়ি তাদের রান্নার জ্বালানি হতো, আবার এই খড়ি দিয়েই বাঁধতেন ঘরের বেড়া।

পাটের আঁশ প্রক্রিয়াজাতের পরবর্তী কাজ ছিল পুরুষদের। পাটখড়ি থেকে ছড়ানো আঁশগুলো বিলের জলে ভালোভাবে ধুয়ে শুকাতে দিত বাঁশের আড়ে। দু-তিন দিন নিরবচ্ছিন্ন রোদ পেলে আঁশগুলো শুকিয়ে ‘হলহলা’ হয়ে যেত। এর মধ্যে ঘণ্টা দু ঘণ্টা পর পর সেগুলো উল্টে দেওয়া নিয়ম, যাতে এপাশ ওপাশ ঠিকঠাক শুকোয়। সোনালী আঁশের মাথার দিকটা শুকালে সেদিকটাতে বিশেষ পদ্ধতিতে একটা গিঁট দিতে হয়। এরপর ফাইনাল ড্রাইং। কিন্তু ভাদ্র মাসের রোদের কি কোনো ভরসা আছে? ঝমঝমিয়ে অকস্মাৎ নেমে আসত বৃষ্টির হানা। তখন দেখা যেত কিষাণ-কিষাণী আর তাদের ছেলেপুলেদের দৌড়ঝাপ—ঘরে নে ঘরে নে…!

এইসব জলজ স্মৃতিতে মোহন-রঙিন আমার শৈশব। পাটের গন্ধে মোহময় শৈশবের আষাঢ়-শ্রাবণ। আমার শৈশব মিশে আছে পাটের গন্ধে। অনেকের কাছে পাটের এই তেতো গন্ধ অসহ্য লাগতে পারে, কিন্তু এখনও যখন আমি গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে গিয়ে বিলের জল থেকে পাটের আঁশ-পচা গন্ধ কিংবা শুকনো পাটের গন্ধ পাই, মনে হয়, আমার সারা শরীর অবশ হয়ে শৈশবের জলজ স্মৃতিতে মিশে যাচ্ছে।

#আমারজলশৈশব


Leave a Reply

Your email address will not be published.