কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থী এবং পক্ষীয় রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিবর্গ মাঝেমধ্যে আফসোস ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন: জুলাই বিপ্লবের পর মাদরাসার শহীদ ও আহত এবং বিপ্লবে তাদের অংশগ্রহণকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বা হচ্ছে না।
প্রথম কথা
আপনাকে মূল্যায়ন করবে কে? রাষ্ট্র, সরকার বা বিপ্লবপন্থী কোনো রাজনৈতিক দল? তার আগে আমাকে বলেন, আপনি নিজে নিজের মূল্যায়ন করেছেন?
কওমি মাদরাসা থেকে যেসব শিক্ষার্থী শহীদ হলেন এবং যারা আহত হলেন, তাদের নিয়ে মাদরাসাগুলোর রেসপন্স কী? মাদরাসাগুলো এইসব শহীদদের স্মরণে দোয়া মাহফিল করেছে? গাজীদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা জানিয়েছে? মাদরাসার যেসব অভিভাবক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেমন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন, শিক্ষাবোর্ডগুলো, তারা কি শহীদ-গাজী পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছে? তাদের আর্থিকভাবে সহায়তা দিয়েছে?
আমার যদ্দুর জানাশোনা, আমাদের কওমি মাদরাসার ব্যক্তিবর্গ এসবের কিছুই করেননি।
তো, আপনার নিজের প্রতিষ্ঠানই যখন আপনাকে মূল্যায়ন করে না তখন রাষ্ট্র, সরকার বা রাজনৈতিক পক্ষের কাছে মূল্যায়ন চাইতে যাওয়া তো অত্যন্ত লজ্জাজনক কাজ। যে ‘কওমি মাদরাসা’র অবদান বলতে বলতে আপনি আমি মুখে ফেনা তুলে ফেলি, সেই কওমি মাদরাসাই তো আপনাকে ধারণ করে না, আপনার আপনার অর্জন, অবদান, আত্মত্যাগকে তারা মূল্যায়ন করে না। তাহলে আপনি আমি কোন মুখে অপর পক্ষের কাছে গিয়ে নিজের স্টেক আব্দার করি?
এগুলো আমাদের জন্য লজ্জার না? উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে ফেলার মতো অপমানজনক না?
দ্বিতীয় কথা
বাংলাদেশের জন্মের পর দেশরক্ষা ও দেশের মানুষের মুক্তির জন্য জুলাই বিপ্লব কওমি মাদরাসার সবচে বড় অর্জন। এটা জাতীয় জীবন এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে কত বড় অর্জন আমাদের হুজুররা চিন্তাও করতে পারছেন না। যে বৃহৎ বিপ্লবী ধর্মীয় গোষ্ঠীটিকে স্বাধীনতাপরবর্তী ৫০ বছর ধরে নানা ‘দেশবিরোধী’ অপবাদ দিয়ে দমিয়ে রাখা হয়েছিল, তাদের সকল অর্জনকে শেকলে বেঁধে একঘরে করে রাখা হয়েছিল, এই জুলাই বিপ্লবে তাদের দুঃসাহসিক অবদান ও আত্মত্যাগ সেই সকল হিংসাত্মক শেকল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
জুলাই বিপ্লব কওমি শিক্ষার্থীদের বুকের পাটা আকাশের সমান স্ফীত করে দিয়েছে। এই দেশের জন্যও যে তাদের জীবন ও আত্মত্যাগ একটা বড় অর্থ রাখে, এই বোধ ও বিশ্বাস তাদের হৃদয়ে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। জুলাইয়ে কওমি শহীদ ও গাজীদের অবদান তাদের সনাতন বিশ্বাসকে দ’লে পিষে নতুন এক চেতনা জাগ্রত করে দিয়েছে। তারাও এই দেশের নাগরিক, এই দেশের দেশপ্রেমিক বিপ্লবী জনতা তারাও। দেশের যে কোনো সংকটে তারা বুক চিতিয়ে লড়তে জানে সবার আগে। জালিমের বিরুদ্ধে জি*হাদের তাকবিরধ্বনি তারাই উচ্চারণ করে সবার আগে।
জুলাই বিপ্লব এভাবেই তাদের বিশ্বাসের চেতনায় বিরাট এক প্রলয় ঘটিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু দুঃখের বিষয়ই বলতে হবে, ৭১’-এর মতো আমাদের হুজুররা এই জুলাই বিপ্লবের অর্জনকেও হাতছাড়া করে চলেছেন। তারা অনুধাবনই করতে পারছেন না যে তাদের গুরুত্ব ও অর্জন কত বিশাল। তারা সেই বিশাল অর্জনকে নিজেরা মূল্যায়ন না করে নানা গোষ্ঠীর কাছে গিয়ে নিজেদের অর্জনের সাফাই গাইছেন। এগুলো খুবই নিম্ন বুদ্ধির কাজ।
তৃতীয় কথা
প্রতিটি মাদরাসায় জুলাই বিপ্লবে শহীদ মাদরাসা-শিক্ষার্থীদের নামে পাঠাগার গড়ে তুলেন। শহীদদের নামে মাদরাসার ভবনের নামকরণ করুন। শহীদদের নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতা করুন, বক্তব্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করুন, কুইজ প্রতিযোগিতা করুন। প্রত্যেকটা কওমি মাদরাসায় শহীদদের সংক্ষিপ্ত জীবনী অবশ্যপাঠ্যের তালিকাভুক্ত করুন। বোর্ডের বইগুলোতে জুলাই বিপ্লবে কওমি-শিক্ষার্থী ও শহীদদের অবদান সন্নিবেশ করুন।
অনাগত দিনে বাংলাদেশের আনেওয়ালা সকল তালিবুল ইলম যেন তাদের শহীদ ভাইদের আত্মত্যাগ ও অবদানকে জানতে পারে, পড়তে পারে, বুঝতে পারে সেই লক্ষ্যে মাদরাসায় মাদরাসায় পত্রিকা-স্মরণিকা প্রকাশ করুন। প্রত্যেকজন শহীদ ও গাজীদের নিয়ে ডকুমেন্টারি বই-পুস্তক প্রকাশ করুন। কওমি শিক্ষার্থীদের ভিডিও-ফুটেজ সংগ্রহ করে ভিডিও ডকুমেন্টারি নির্মাণ করুন। এসব ছড়িয়ে দিন। সারাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিন।
প্রত্যেকজন কওমি শিক্ষার্থী নিজের পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও নিজ এলাকার মানুষের কাছে কওমি-শহীদদের আত্মত্যাগ ও অবদান গর্ব করে বয়ান করুন। মাদরাসার শিক্ষকগণ ছাত্রদের কাছে, মসজিদের ইমাম-খতিবগণ জুমআর খুতবায় এবং বক্তারা তাদের বয়ানে বারংবার কওমি-শহীদদের অবদান জারি রাখুন।
দাওরায়ে হাদিস মাদরাসাগুলোতে খতমে বুখারি উপলক্ষে তাকমিলের (মাস্টার্স) শিক্ষার্থীরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড করে থাকেন। এবারকার খতবে বুখারি উৎসর্গ করুন শহীদদের জন্য। তাদের স্মরণে ক্রিয়েটিভ ও ইনিশিয়েটিভ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করুন। যুগ যুগ ধরে আপনাদের অবদান পরবর্তী প্রজন্ম মনে রাখবে।
মনে রাখবেন, আপনার স্টেক আপনাকেই বুঝে নিতে হবে। কারো কাছে আব্দার করে বা ভিক্ষা চেয়ে স্টেক আদায় করা যায় না। এটা লজ্জার, অপমানের।
জুলাই ছিল আমাদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের বিপ্লব, এবার সেই বিপ্লবকে সাংস্কৃতিকভাবে সুদৃঢ়করণ আপনাকে আমাকেই করতে হবে। সেই বিপ্লবকে সাংস্কৃতিকভাবে আমাদের মধ্যেই ছড়িয়ে দিতে হবে। নইলে আমাদের এই আকাশচুম্বী অর্জন ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে কালের প্রবাহে। কাল হয়তো আবারও আপনার দিকে কেউ একজন আঙুল তুলে প্রশ্ন করবে, এই দেশের জন্য কওমি মাদরাসা একটা বোঝা!
সেই প্রশ্ন সংঘটিত হওয়ার আগেই আপনি আপনার ‘মুরুব্বি’কে প্রশ্ন করুন।