ডিয়ার এনসিপি, National Citizen Party – NCP
* আপনারা টিভি টক শোতে তর্কবাগীশগিরি করে আর কত দিন মানুষের সিমপ্যাথি অর্জনের চেষ্টা করবেন? গণমানুষের রাজনীতিতে নামেন। টিভি ক্যামেরার লেন্স ছেড়ে ট্রাভেল ক্যামেরা নিয়ে তৃণমূল মানুষের কাছে যান।
* এখনই অনেকে আওয়াজ উঠানো শুরু করেছে, আপনারা ‘জুলাইয়ের আবেগ’ বিক্রি করে রাজনীতি আর কতদিন করবেন? এই প্রশ্ন এখন গুটিকতেক মানুষ করছে, কিন্তু আগামীকাল অনেকেই করবে। আবেগ দিয়ে বেশিদিন রাজনীতি করতে পারবেন না। যেমন আমাদের সময়ের তরুণ প্রজন্ম বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ আর ‘স্বজন হারানোর বেদনা’ শুনতে শুনতে।
* উপরন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আপনারা জুলাইয়ের শহীদ আর আহতদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে নেতা হয়েছেন, কিন্তু জুলাইয়ের শহীদদের যথাযথভাবে রিকগনাইজ এবং তাদের পরিবারকে সহযোগিতা করতে আপনাদের উদ্যোগ যথাযথ নয়। আহতদের চিকিৎসা ও সঠিক পুনর্বাসনেও আপনাদের গাফলতি রয়ে গিয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারকে বাধ্য করতে আপনাদের আগ্রহ আশাব্যঞ্জক নয়। এটা আপনাদের জন্য ব্যাকফায়ার হতে পারে।
* মনে রাখবেন, আপনারা এখন ইচ্ছা করলেই আর বলতে পারবেন না যে, এসবের দায়-দায়িত্ব এখন আর আমাদের নেই। মানুষ ইউনুস সরকারকে যতটা তোয়াজ করে সেটা আপনাদের জন্যই, আপনাদের সম্মিলিত অর্জনের ফলাফলের কারণেই। সুতরাং জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়নের দায় থেকে আপনারা এক পা-ও পিছিয়ে আসতে পারবেন না।
* আপনাদের সবচে বড় রিজার্ভ ব্যাংক হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। সুতরাং আপনারা যেকোনো সিদ্ধান্তই নেন না কেন সেই সিদ্ধান্তের বিপরীতে তরুণ প্রজন্মের রেসপন্স কেমন হবে সেটা মাথায় রাখবেন।
* তরুণ প্রজন্মকে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক, সমাজসেবামূলক, যোগাযোগধর্মী কাজে সম্পৃক্ত করুন। তাদের বুঝতে দিন রাষ্ট্র সংস্কার কাজে তারাও আপনাদের মতই সমান দায়িত্বশীল এবং সমান হকদার। এই রাষ্ট্র বিনির্মাণে তাদের অশংগ্রহণ সর্বদাই জরুরি। কেবলমাত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক মিছিল-সমাবেশ করে তাদের সাপোর্ট ধরে রাখতে পারবেন না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসার শিক্ষার্থীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বহুমুখী কাজে সম্পৃক্ত করুন।
* আপনাদের দলীয় মূলনীতি এবং ইশতেহারে তরুণ প্রজন্মের যুগচাহিদা যাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
* তরুণ প্রজন্ম সংস্কার, সংবিধান, সরকারব্যবস্থা নিয়ে খুব বেশি ভাবে না। তারা প্রত্যক্ষভাবে দেখতে চায় উন্নয়ন, শিক্ষার আধুনিকরণ, জব অপরচুনিটি, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ও প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা, প্রবাসে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের ‘উন্নত মম শির’ অবস্থান। কেবলমাত্র কাগজে কলমের উন্নয়ন কথাবার্তা বা সংস্কার তাদের সাপোর্ট ধরে রাখতে পারবে না দীর্ঘ সময়, তারা চাক্ষুষ পরিবর্তন দেখতে আগ্রহী। তাদের সামনে পরিবর্তনের সুফল নিয়ে আসুন।
* আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কথা বারবার বহুভাবে বলছেন আপনারা। কোনো দলকে নিষিদ্ধকরণ যেহেতু রাষ্ট্রীয় এখতিয়ারে পড়ে, সেহেতু আপনারা রাষ্ট্রকে চাপ দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হলে লীগের নেতাকর্মীরা অধিকাংশই কনভার্ট হয়ে হয়তো বিএনপি বা জামাতে যোগ দেবে, এটা নিশ্চিত। আওয়ামী লীগ একটা নামমাত্র। এই নামের পেছনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ছিল। নাম মিটিয়ে ফেললেই মানুষগুলো ভ্যানিশ হয়ে যাবে না। তাদের অস্তিত্ব নাই হয়ে যাবে না। বিষয়টা মাথায় রাখবেন।
* এ জন্য আপনাদেরকে বিএনপি ও জামাতের চেয়ে বেশি জনসমর্থন তৈরি করতে হবে, যাতে লীগের লোকজন বিএনপি-জামাতে কনভার্ট হয়ে গেলেও আপনাদের জনসমর্থনের তোড়ে তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে। আমি আবারও বলছি, মানুষ আপনাদের ভালোবাসে। কিন্তু ভালোবাসা আর রাজনৈতিক সমর্থন এক জিনিস নয়। আপনাদেরকে জনগণের কাছে গিয়ে, তাদের জন্য কাজ করে সেই রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে হবে। ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে ভালোবাসা কামাই করা যায়, রাজনৈতিক সমর্থন নয়।
* আওয়ামী লীগ ও লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা যাতে বলবৎ থাকে সেজন্য স্বৈরাচার হাসিনা ও তার প্রত্যেক দোসরকে শনাক্ত করুন। বিগত ১৫ বছরে তাদের দুঃশাসন, দুরাচার, নৈরাজ্য, দুর্নীতি, রাহাজানি রেফারেন্সসহ তালিকাবদ্ধ করুন। ওয়ার্ড থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কৃত তাদের সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি-দুরাচার তালিকাবদ্ধ করুন এবং সেটা অনলাইনে সহজলব্ধ করুন। তাহলে লীগের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীর আমলনামা মানুষের হাতের নাগালে থাকবে এবং সহজেই প্রত্যেককে চিহ্নি করা যাবে।
* আপনারা আজ তরুণ, অধিকাংশ নেতার বয়স ৩০-এর নিচে। এজন্য তরুণ প্রজন্ম আপনাদের ক্যারিশমাটিক হিরো মনে করে। কিন্তু আপনাদের বয়স বাড়বে, রাজনীতির অনেক জটিল মারপ্যাঁচে আপনাদের আপস করতে হবে। তখন আপনারা আর হিরো থাকবেন না। এ জন্য আপনাদের দলের মূলনীতিতে একটি শক্তিশালী ধারা রাখুন, এনসিপির কার্যকরী পরিষদের ৫০% সদস্যের বয়স ৩০-এর নিচে থাকতে হবে। এতে ভবিষ্যতে তরুণ প্রজন্ম এনসিপিতে নিজেদের প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকবে।
* আপনাদের সবচে বড় দুর্বলতা আমার কাছে মনে হয়েছে আপনাদের নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দলের দক্ষ পাবলিক রিলেশনের (PR) অভাব। এই সমন্বয়হীনতা এবং PR অদক্ষতা দ্রুত দূর করুন।
* মেজর আব্দুল জলিলের সেই মহত্তম বাণীটি সবসময় মনে রাখবেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন’। আপনারা রাজনীতির মাঠে পা দিয়ে সেই ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’ অপ্তবাক্যের শপথ গ্রহণ করেছেন। সুতরাং যখনই মনে হবে যে রাজনীতি তো বেশ সহজ, তখনই মনে রাখবেন, আপনি সুধারার রাজনীতির পথ থেকে দূরে সরে গেছেন। আপনাদের সামনে এখন একটা মুহূর্তও ‘সহজ’ বলে কোনো শব্দ নেই।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ