‘সারজিস’ নাম সম্পর্কিত ইসলামী ইতিহাসে দুজন ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়।
এক. নবীজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১২ বছর বয়সে চাচা আবু তালিবের সঙ্গে ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়ার দামেস্ক অভিমুখে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে উত্তর আরবের ‘তাইমা’ নামক স্থানে যাত্রাবিরতির সময় একজন খ্রিষ্টান পাদরির সঙ্গে নবীজির কাফেলার সাক্ষাত হয়। পাদরি নবীজিকে দেখে চিনতে পারেন যে এই কিশোর ভবিষ্যতে নবী হবেন। তখন তিনি চাচা আবু তালিবকে পরামর্শ দেন, আপনার ভাতিজাকে দামেস্ক না নিয়ে এখান থেকেই আবার মক্কায় পাঠিয়ে দিন। কেননা দামেস্কে অনেক ইহুদির আনাগোনা। তারা যদি কোনোভাবে আপনার ভাতিজার নববী গুণাবলি শনাক্ত করতে পারে তবে নির্ঘাৎ তাকে হত্যা করবে। এর আগেও তারা বহু নবীকে হত্যা করেছে শুধু এই কারণে যে—নবী তাদের বংশে জন্ম না নিয়ে কেন অন্য বংশে জন্ম নিল!পাদরির পরামর্শে ভীত হয়ে আবু তালিব তাইমা থেকেই নবীজিকে দুজন সফরসঙ্গী সহকারে মক্কায় পাঠিয়ে দেন।
নবীজির শুভাকাঙ্ক্ষী ও প্রভূত জ্ঞানী এই পাদরির নাম ছিল সারজিস, অথবা জারজিস বা জিরজিস। (সিরাতে ইবনে হিশাম সূত্রে সীরাত বিশ্বকোষ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৭২)
এই ঘটনার ১৩ বছর পর নবীজি আবার খাদিজা (রা.)-এর চুক্তিভিত্তিক ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়ার দামেস্ক ভ্রমণ করেন। খাদিজার সঙ্গে তখনও তার বিয়ে হয়নি। এই সফরে আবার নবীজির সঙ্গে পাদরি সারজিসের সাক্ষাত ঘটে। নবীজি তখন ২৫ বছরের সুঠাম যুবক, যদিও তখন পর্যন্ত তিনি নবুওয়াত লাভ করেননি। তবে তাকে দেখেই পাদরি সারজিস তাকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দান করেন এবং ‘কালেমাবাক্য’ উচ্চারণ করেন।
ইবনে হাজার আসকালানি, ইমাম জাহাবি, আবু নুআইম প্রমুখ বিশেষজ্ঞগণ মন্তব্য করেছেন, পাদরি সারজিস নবীজির নবুওয়াত লাভের পূর্বেই তার ওপর ঈমান এনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
:: দুই. দ্বিতীয় যে ব্যক্তির নামের সঙ্গে ‘সারজিস’ নামটি সম্পর্কিত সেটি তার নিজের নাম নয়, তার বাবার নাম। তিনি নাফি ইবনে সারজিস আবু আব্দুল্লাহ আদ-দাইলামি (রহ.)। তিনি তাবেয়ি এবং হিজরি প্রথম শতাব্দীতে মদিনার বিখ্যাত হাদিসের শিক্ষক ছিলেন।
‘নাফি ইবনে সারজিস’ নামে তিনি খুব একটা পরিচিত নন। তিনি পরিচিত ‘নাফি মাওলা ইবনে উমর’ নামে। এই নামের পেছনে ছোট্ট একটি ইতিহাস আছে।
নাফি ইবনে সারজিস ছিলেন দাইলামের (বর্তমানে ইরানের গিলান অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত) বাসিন্দা। খলিফা উমর ইবনে খাত্তাবের (রা.) শাসনামলে মুসলিম সেনাবাহিনী যখন পারস্য জয় করে তখন নাফি মুসলিম সৈন্যদের হাতে বন্দী হয়ে খেলাফতের রাজধানী মদিনায় আসেন। এখানে তাকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়। তিনি তখন নিতান্ত এক কিশোর। তবে ছিলেন প্রখর মেধাবী ও বুদ্ধিমান।
মদিনায় তখন আবদুল্লাহ ইবনে উমর বেশ প্রভাবশালী হাদিসের শিক্ষক। তিনি কিশোর নাফিকে ক্রীতদাস হিসেবে কিনে নিয়ে আজাদ করে দেন এবং তাকে শিক্ষা-দীক্ষায় নিযুক্ত করেন। কয়েক বছরের মধ্যে নাফি ধর্মীয় ও হাদিসের জ্ঞানে বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তার শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে উমর এবং আবু সাঈদ আল-খুদরি (রা.)।
দীর্ঘ জ্ঞানসাধনা ও হাদিসচর্চার পর পরবর্তীতে উমাইয়া খেলাফতের সময়ে নাফি ইবনে সারজিস মদিনার অন্যতম হাদিসের শিক্ষক হিসেবে বরিত হন। তার হাদিসের শাগরেদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মালেকি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালিক ইবনে আনাস, ইবনে শিহাব আল-জুহরি, আইয়ুব আস-সাখতিয়ানি (রহ.) প্রমুখ।
মুহাদ্দিস নাফি ইবনে সারজিস উমাইয়া খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের খেলাফতকালে মুফতির পদ গ্রহণ করেন।
তিনি ১১৭ হিজরিতে (৭৩৫/৭৩৬ খ্রিস্টাব্দে) মারা যান বলে অনুমান করা হয়, যদিও অন্যান্য ইতিহাসবিদ বলেছেন যে তিনি ১২০ হিজরিতে মারা যান। (ইবনে খাল্লিকানের আল-ওয়াফায়াতুল আইয়ান ও সাঈদ আল-আন্দালুসির জাওয়ামি)