বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সামনে ও নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং এখনও দিয়ে যাচ্ছেন যেসব শিক্ষার্থী, তাদের অনেকেই কওমি মাদরাসার ছাত্র। বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতৃবৃন্দের মধ্যে যারা কওমি মাদরাসায় পড়েছেন, তাদের অনেককে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি।
এবং তাদের চিনি বলেই আমি জানি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে ‘আমাদের মাদরাসাগুলো’র ছাত্র-শিক্ষকরা কখনোই তাদের ভালো চোখে দেখেনি। মাদরাসা থেকে পাশ করে কোনো মাদরাসায় শিক্ষকতা না করা বা মসজিদের ইমামতি না করার কারণে তাদের শুনতে হয়েছে নানা গঞ্জনা, নানা অপবাদ। ‘পাশ্চাত্য’ সিলেবাসের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তারা ‘হালাক’ হয়ে গেছে, তাদের মাদরাসার পড়াশোনা ‘কবুলিয়্যাত’ পায়নি, তাদের ওপর উস্তাদদের ‘লা’নত’ রয়েছে—তাদের ব্যাপারে এমনতর আরও বহু কুৎসা রটানো হয়েছে মাদরাসার ভেতরে-বাইরে।
এখনকার মাদরাসার মনোভাব কেমন আমি জানি না, কিন্তু এই তো কিছুদিন আগেও আমি ফেসবুকে অনেক ইসলামি ‘সেলিব্রিটি’কে বলতে দেখেছি, ভার্সিটিতে পড়ার কারণে সে নাস্তিক হয়ে গেছে, সে পশ্চিমাদের দালালে পরিণত হয়েছে, সে ওরিয়েন্টালিস্ট প্রভাবিত, সে জাতে উঠতে এমন এমন করছে ইত্যাদি। মাদরাসা-শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা যেন এক অভিশপ্ত বিদ্যার্জন!
অথচ আজ দেখুন তারা ইতিহাস বদলে দিয়েছে। কওমি মাদরাসার এই ‘হালাক’ শিক্ষার্থীরাই বিপ্লবের ফ্রন্টলাইনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। যখন আমাদের মাদরাসাগুলো অস্তিত্ব রক্ষার জন্য স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে টু শব্দটি পর্যন্ত করতে ভয় পেয়েছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মাদরাসা-শিক্ষার্থীরা প্রতিটি মিছিল আর আন্দোলনে সবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। কোনো জালিমশাহীর পরোয়া করেনি। মাদরাসার হুজুররা যখন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী পেশিশক্তির ভয়ে মাদরাসার ছাত্রদের বিপ্লবে শামিল হতে দেয়নি, তখন ভার্সিটির কওমি-শিক্ষার্থীরা রাজপথে লড়াই করে রক্তাক্ত হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে, আবার ফিরে এসেছে পূর্ণ প্রাণশক্তি নিয়ে। তারা ছাত্রলীগের লাঠি-রামদা আর পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছে।
যাদের মাদরাসার জ্ঞানার্জন ‘কবুলিয়্যাত’ পায়নি, যারা উস্তাদদের ‘লা’নতপ্রাপ্ত’ বলে আমরা হররোজ শুনে এসেছি—তারা প্রমাণ করেছে, আল্লাহর এই জমিনে জুলুম ও জালিমের সামনে সিনাটান করে সত্য উচ্চারণ করাই সর্বোত্তম জিহাদ। অথচ তখন আমাদের মাদরাসাগুলো জালিমের রোষানলের ভয়ে মাদরাসার গেইট বন্ধ করে রেখেছে।
করণীয়
একসময়ের ধারণা, মতবাদ, চিন্তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়ে যায়। পরিবর্তন হতে খুব বেশি সময় নেয় না। সুতরাং চিন্তা করুন ভবিষ্যত নিয়ে। আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখান থেকে দেখতে চেষ্টা করুন আপনার সামনের পথ। শুধু পেছনে তাকিয়ে নানা নজরিয়া পেশ করে গুটিসুটি মেরে তসবিহ জপলে জুলুম ও জালিমের বিরুদ্ধে জিহাদ হয় না। ওটাকে কাপুরুষতা বলে।
কূপমণ্ডুকের মতো গণ্ডিবদ্ধ জীবন নিয়ে গৌরব না করে বলতে শিখুন যে, আপনি যে কূপের মধ্যে আবদ্ধ আছেন, সেখান থেকে আপনি আকাশের ক্ষুদ্র একটি অংশই কেবল দেখতে পারছেন। বস্তুত আকাশ আপনার ‘চিন্তার’ দৃষ্টিসীমার চাইতে আরও অনেক বিশাল, অনেক মহান। আপনাকে সবসময় আকাশের বিশালতা ও মহত্বের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। আপনার দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার উপর নয়।
জ্ঞানার্জনের সকল পথ ও পদ্ধতি গ্রহণ করুন এবং উচ্চতর জ্ঞানার্জনে যারা ব্যাপ্ত হতে চায় তাদের সাধুবাধ জানান। জ্ঞানই মানুষকে সকল ভয় ও জড়তা থেকে মুক্ত করে। অজ্ঞতা শুধুই আমাদের ক্ষুদ্র করে রাখে।