এ বছর (২০২৪ সাল) বাংলাদেশের কওমি মাদরাসার কেন্দ্রীয় সমাপনী পরীক্ষায় মোট ৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক বোর্ডের অধীনে অংশগ্রহণ করেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী।
এর মধ্যে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক) বোর্ডের অধীনে ১৫ হাজারের বেশি মাদরাসার তিন লাখ ২৫ হাজার পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।
বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ বোর্ডের অধীনে প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।
জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ-এর অধীনে মোট ২৬৫টি মাদরাসার সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়।
আযাদ দ্বীনী এদারা সিলেট বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেয় ২৩ হাজার শিক্ষার্থী।
তানযীমুল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশ বোর্ডটির অধীনে ২৩০০-এর বেশি মাদরাসার প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।
আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বোর্ডের অধীনেও অংশগ্রহণ করে বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থী।
এছাড়া হাইয়াতুল উলইয়া’র কেন্দ্রীয় দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান-তাকমিল) পরীক্ষার ২৯৪টি কেন্দ্রে সর্বমোট ৩১,৯৯৯ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ছাত্র ১৭,১৪৫ জন এবং ছাত্রী ১৪,৮৫৪।
অন্যদিকে বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় এবার মোট ছয় স্তরে ৩,২৫,৩২৪ (তিন লাখ ২৫ হাজার ৩২৪) জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে ১,৩৪,৭২৩ (এক লাখ ৩৪ হাজার ৭২৩) জন ছাত্র এবং ১,৯০,৬০১ (এক লাখ ৯০ হাজার ৬০১) জন ছাত্রী।
উল্লেখ্য, গত বছর ২০২৩ সালে বেফাক বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত ছয় স্তরের পরীক্ষায় মোট অংশ নেয় দুই লাখ ৮২ হাজার ৯২৬ জন। চলতি বছর বিগত বছরের তুলনায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার ৩৯৮ জন বেশি।
এখানে এই পরিসংখ্যান বিচার করে আমরা কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারি।
এক. এ বছরের বেফাক বোর্ড পরিচালিত কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা ছাত্র-ছাত্রীদের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ছাত্রের তুলনায় ছাত্রীর সংখ্যা 55,878 জন বেশি। এ থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট:
ক. বাংলাদেশে মহিলা/বালিকা মাদরাসার সংখ্যা পুরুষ মাদরাসার চেয়ে অধিক হারে বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই ধারা আরও বৃদ্ধি পাবে।
খ. মেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষার ব্যাপারে মানুষের মাঝে সচেতনতা ও প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে।
গ. মেয়েদের ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে মহিলা/বালিকা মাদরাসাগুলোর ভূমিকা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ঘ. মহিলা/বালিকা মাদরাসা নিয়ে সমাজে নানা নেতিবাচক প্রচারণা সত্ত্বেও এ ধরনের মাদরসাগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রয়েছে।
দুই. বেফাক পরিচালিত পরীক্ষায় নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণিগুলোতে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি হলেও, হাইয়াতুল উলইয়া পরিচালিত সমাপনী দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) পরীক্ষায় ছাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। হাইয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষায় ছাত্রের তুলনায় ছাত্রীর সংখ্যা ২,২৯১ জন কম। এ থেকে কয়েকটি বিষয় সামনে আসছে:
ক. নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের সংখ্যা ছাত্রদের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও উচ্চ মাধ্যমিক স্নাতকোত্তর (তাকমিল) পর্যায়ে এসে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে।
খ. উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মহিলা/বালিকা মাদরাসাগুলো থেকে ছাত্রীদের ঝরে যাওয়ার মূল কারণ সম্ভবত বিয়ে।
গ. দাওরায়ে হাদিসে পৌঁছার আগেই মাদরাসার ছাত্রীদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, যেহেতু মাদরাসা থেকে দাওরা পাশ করার পর একজন ছাত্রীর আয়-রোজগারের কোনো সুযোগ বা সম্মতি থাকে না, কাজেই দাওরার আগে তার বিয়ে হয়ে গেলেও তেমন কিছু যায় আসে না।
ঘ. এছাড়া মাদরাসা থেকে দাওরা পাশ করার পর যেহেতু একজন মাদরাসাছাত্রীর আর উচ্চতর পড়াশোনা করার কোনো সুযোগ নেই, কাজেই দাওরার আগে বা পরে বিয়ে হয়ে গেলে ছাত্রীর অভিভাবক বা মাদরাসা কর্তৃপক্ষের কোনো অসম্মতি থাকে না।
ঙ. অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের মনোভাবই এমন যেন তারা কেবল বিয়ের জন্যই একজন ছাত্রীকে মাদরাসায় পড়াচ্ছেন। যোগ্য একজন আলেমা বা ইসলামি ফকিহা গড়ে তোলা নয়, তাদের লক্ষ্য থাকে কেবলই বিয়ের জন্য একজন সুশীল পাত্রী হিসেবে ছাত্রীকে গড়ে তোলা।
চ. এই ধারা চলমান থাকলে মাদরাসাগুলোতে মেধাবী ও মানসম্মত নারীশিক্ষকের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যার ফলে মহিলা/বালিকা মাদরাসা নিয়ে অভিজ্ঞ মহলের শংকা বাড়বে বৈ কমবে না।
মাসিক নবধ্বনি মার্চ সংখ্যার সৌজন্যে