কয়েকদিন ধরে রাজনৈতিক মহলে একটা প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নটা করা হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের। প্রশ্নটা হলো: ‘আপনারা কারা’।

সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দীন, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন এবং অন্য আরও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ছাত্রনেতাদের সামনে বার বার প্রশ্ন তুলছেন যে রাষ্ট্র নিয়ে, প্রশাসন নিয়ে, রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক সংস্কার নিয়ে কথা বলার ‘আপনারা কারা’?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি একটু ইতিহাস ঘাঁটতে চাই।
এক
নবম-দশম শতাব্দীতে আব্বাসী খেলাফত দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে এশিয়া এবং আফ্রিকায় অনেকগুলো স্বতন্ত্র মুসলিম সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্যব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তাহিরি, সাফাভি, ফাতেমি, সামানি, গজনভি ইত্যাদি সাম্রাজ্য আব্বাসী খেলাফতের প্রতি ন্যূনতম মান্যতা স্বীকার করে স্বাধীনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকে।
কিন্তু খেলাফতের বাইরে স্বতন্ত্র মুসিলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় ধর্মীয় কিছু সমস্যা তৈরি হয়। কারণ খেলাফতের বাইরে ভিন্ন কোনো জাতিরাষ্ট্র বা সীমানাধর্মী রাষ্ট্রের ধারণা ইসলাম একসেপ্ট করে না। তাহলে কি এই মুসলিম সাম্রাজ্য বা রাষ্ট্রগুলোকে অবৈধ বা বিদ্রোহী হিসেবে বিবেচনা করা হবে?
এই সমস্যার সমাধান দেন দশম শতাব্দীর তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ইমাম গাজালি (রহ.)। তিনি রায় দেন, কোনো মুসলিম শাসক বা সুলতান যতদিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় খলিফার কর্তৃত্ব তাত্ত্বিকভাবে মেনে নেবে ততদিন পর্যন্ত তার শাসনব্যবস্থা অধার্মিক বা অবৈধ বলে বিবেচিত হবে না। এই মেনে নেয়াটা কেবলমাত্র প্রধান মসজিদে জুমআর নামাজে খলিফার নামে খুতবাপাঠ কিংবা তার নামে মুদ্রা প্রচলনের মাধ্যমে হতে পারে। (The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, Richard M. Eaton, ইফা অনুবাদ, পৃষ্ঠা ৫২)
ইমাম গাজালির মৃত্যুর এক শ বছর পর স্বতন্ত্র মুসলি রাষ্ট্র বিষয়ে ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি (রহ.) আরও সাহসী মন্তব্য করেন। তিনি পঙক্তির মাধমে বলেন:
পৃথিবী একটি বাগান, যার মালি হলো রাষ্ট্র (দাওলাহ)
রাষ্ট্র হলো সুলতান, যার অভিভাবক হলো আইন (শরিয়াহ)
আইন একটি নীতি, যা দিয়ে রক্ষা হয় রাজত্ব (মুলক)
রাজত্ব একটি নগর, যা নিয়ন্ত্রণে আনে সেনাবাহিনী (লস্কর)
শক্তিশালী সেনাবাহিনী নিশ্চিত করে (উন্নয়ন) ও সম্পদ (মাল)
সম্পদ সৃষ্টির মাধ্যম হলো জনসাধারণ (রায়ত)
জনসাধারণ সেবক হয়ে ওঠে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে (ইনসাফ)
ন্যায়বিচারকে কেন্দ্র করেই সমৃদ্ধ হয় পৃথিবী (আলম)
(The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, Richard M. Eaton, ইফা অনুবাদ, পৃষ্ঠা ৫৩)
এই তত্ত্ব দিয়ে ইমাম রাজি সিদ্ধান্ত দেন যে, একটি মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য প্রধান উপকরণ হলো জনগণের সমৃদ্ধি, সুরক্ষা, আইনের শাসন এবং তাদের প্রতি শাসকের ন্যায়বিচার। এই উপকরণগুলো পাওয়া গেলে যে কোনো মুসলিম রাষ্ট্রই বৈধতার দাবি রাখে।
ইমাম রাজি ছিলেন আফগানিস্তানের ঘোরি বংশের প্রধান ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষক। তার ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হেরাতের শাসক মুইজুদ্দিন মুহাম্মদ ঘোরি হিন্দুস্তান আক্রমণ করেন এবং দিল্লির রাজা পৃথ্বিরাজকে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পরাজিত করে ১১৯২ সালে দিল্লিতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
বঙ্গবিজয়ী সেনাপতি ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ারও ছিলেন ঘোরি বংশের আশীর্বাদপুষ্ট এবং ইমাম রাজি দ্বারা প্রভাবিত একজন বিজেতা।
দুই
এবার ইতিহাসের আলোকে ‘আপনারা কারা’ এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাক।
যখন আপনি যে কোনো প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন না কেন, আপনি সে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবেন। এখন আপনার কাজ হলো ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। যে রাষ্ট্রে জনগণের সমৃদ্ধি, সুরক্ষা, আইনের শাসন, বৈষম্যহীন সমাজ এবং জনগণের প্রতি শাসকের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, সে শাসক ধর্মীয় ও নৈতিকভাবে রাষ্ট্রের হকদার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার রাখেন।
ছাত্র-জনতা যদি জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে থাকেন তাহলে এই অভ্যুত্থানের নেতারা সর্বোতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার হকদার এবং রাষ্ট্রীয় যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের একচ্ছত্র অধিকার তাদের রয়েছে। কাজেই কেউ যদি ছাত্র-জনতার নেতাদের প্রশ্ন করেন যে ‘আপনারা কারা’, এটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের অবমাননা এবং শাসকের প্রতি সম্পূর্ণ অনাস্থার প্রকাশ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলে সরকার তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার রাখেন।
মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের নির্দিষ্ট কোনো পন্থা বা পদ্ধতি নেই। ফলে শাসক বা সরকার কখনো অবৈধ হয় না। কারণ, শাসক হওয়ার এমন নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই যার ভিত্তিতে বলা যাবে যে—এই শাসক অবৈধ বা অমুক সরকারের নৈতিক কোনো ভিত্তি নেই। যেহেতু শাসকের বৈধতার নির্ধারিত কোনো পদ্ধতি নেই, তাই তা অবৈধ হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। যেকোনো পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন/দখলের মাধ্যমে যে কেউ শাসক হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞার মাধ্যমে শাসকের সংজ্ঞায়ন করা স্রেফ বকওয়াজ। হাজার বছরের ইতিহাসে দেখুন, পৃথিবীতে যতবার যত শাসক, বিজেতা, সেনাপতি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল/অর্জন করেছেন, তাদের প্রত্যেকের ক্ষমতা অর্জনের পথ ও পদ্ধতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা সাংবিধানিক সংজ্ঞা দিয়ে শাসক নির্ধারণ করা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। সংবিধান তিনিই প্রণয়ন করবেন যিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন করবেন।
আবার প্রত্যেক দেশের শাসনব্যবস্থাও ভিন্ন। এমনকি গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা দেখুন, পৃথিবীর এক দেশের গণতন্ত্রের সঙ্গে আরেক দেশের গণতন্ত্র বা গণতান্ত্রিক শাসন ও শাসকের কোনো সাযুজ্য নেই।
উমর ইবনে খাত্তাব (রা.), ফাতিহ মুহাম্মদ, চেঙ্গিস খান, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এরা সবাই ছিলেন বিজেতা। শত শত শহর ও দেশ তারা যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করেছেন। জয় করার পর তারা সেসব শহর ও রাষ্ট্রে নিজেদের মতো করে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করেছেন। তাদের শাসনকে কি অবৈধ বলার সুযোগ আছে? তাদের কি প্রশ্ন করা যাবে ‘আপনারা কারা’?
তিন
সমস্যা হলো, ছাত্র-জনতার নেতারা বয়সে তরুণ, চরিত্রে সজ্জন, রাজনীতি বিষয়ে অনভিজ্ঞ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে লাজুক। অভ্যুত্থানের পর তারা নিজেদের ভেতরে এই বিশ্বাস ধারণই করতে পারেননি যে তারা একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছেন। এই রাষ্ট্রের সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের একচ্ছত্র অধিকার তাদের রয়েছে। ফলে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার অ্যাটাকিং মুডে না গিয়ে ডিফেন্সিভ মুডে চলে গিয়েছেন। বয়সে তরুণ আর ব্যবহারে লাজুক বলে রাষ্ট্রক্ষমতা প্রদান করেছেন কতিপয় আমলা গোত্রীয় ব্যক্তির হাতে।
এটা উচিত হয়নি। ছাত্রনেতাদের উচিত ছিল নিজেদের মধ্য থেকে বিপ্লবী সরকার গঠন করা। আমলা আর ব্যুরোক্রেসির ফাঁদে পা দেয়া ছিল বড় ভুল। ব্যুরোক্রেসি চলে আইন ও বিধিবিধানের মারপ্যাঁচ দিয়ে। তারা বিপ্লব বুঝে না, দেশপ্রেম তাদের কাছে সচিবালয়ের চাকরি মাত্র। চাকরি ও লাভের বিনিময়ে দেশপ্রেম বিক্রি করতে তাদের কিছু যায় আসে না। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেটা বিসিএস ক্যাডার হয়েছে দেশপ্রেমের ধ্বজা ধরার জন্য নয়, তার কাজ অর্থ উপার্জন করা। এটা মাথায় রাখতে হবে।
রাষ্ট্রক্ষমতা একটি তেজী ঘোড়ার মতো। এটাকে যত দ্রুত দৌড়াবেন তত এর শরীর ও ফিটনেস ভালো থাকবে। এই ঘোড়াকে যদি আস্তাবলে রেখে দিনে দুই বেলা গোসল আর প্রতিবেলা উপাদেয় দানাপানি খাওয়ান, সেটা তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ঘোড়ার রেসের মতো দৌড়ান। রাষ্ট্র ভালো থাকবে। একবার যখন রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করেছেন, সেটাকে সর্বোচ্চ গতিতে দৌড়ানোর কোশেশে রাখেন। রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের জনগণ ভালো থাকবে।

আবারও বলছি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নমনীয় হলে চলবে না। বিপ্লবের পথে নমনীয়তার কোনো স্থান নেই।


Leave a Reply

Your email address will not be published.