‘ভারত আমাদের বন্ধু’ ‘ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী’ ‘ভারত আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সহযোগী’- এইসব বালছাল ন্যারেটিভ আপনারা কীভাবে বিশ্বাস করেন? ইতিহাস তো পড়েন নাই, জানেন না দিল্লি আর বাংলার কনফ্লিক্টের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস।

ভারত কখনোই বাংলার বন্ধু ছিল না। কখনোই না। বাংলা অঞ্চল কোনোদিন দিল্লির শাসন মেনে নেয়নি। আপনাদের সামনে আমি ৩ হাজার বছরের ইতিহাস তুলে ধরে এর প্রমাণ দিতে পারি।
অভিবাসী আর্য মানুষেরা যখন ৩ হাজার বছর আগে উত্তর ভারতে হিন্দু ধর্ম তৈরি করে, তখন থেকে বঙ্গ অঞ্চলের সঙ্গে এই কথিত আর্যদের কনফ্লিক্ট চলে আসছে।

১৫ শ বছর আগে ভারতীয় গুপ্ত সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন বাংলার শাসক শশাঙ্ক। তারপর পাল সাম্রাজ্য, সেন সাম্রাজ্য স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করেছে।

মুসলমান আগমনের পরের ইতিহাস তো আরও চমকপ্রদ। বখতিয়ারের বঙ্গ বিজয়ের পর থেকে এই বাংলা স্বাধীনভাবে শাসন করেছে ইলিয়াস শাহী বংশ, মামলুক বংশ, হোসেন শাহী বংশ, শূর বংশ, কররানি বংশ। ২০০ বছরের এই শাসনামলে দিল্লির সুলতানরা বহুবার বাংলা আক্রমণ করেছে, বহুবার বাংলাকে তাদের অধীন করতে চেয়েছে। কিন্তু প্রতিবার তারা হয়তো বাংলাকে বশ করতে ব্যর্থ হয়েছে নয়তো অল্প কিছুদিন পরই তাদের বিরুদ্ধে বাংলার কোথাও না কোথাও আবার বিদ্রোহ শুরু হয়েছে।

এরপর মুঘল শাসনামলের চিত্রও প্রায় এরকম। বাংলার শাসক শের শাহ শূরি তো সম্রাট হুমায়ুনের দিল্লির সিংহাসনই দখল করে ফেলেছিলেন। দিল্লিকেন্দ্রিক মুঘল উপনিবেশের বিরুদ্ধে ঈসা খাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসও আমাদের সবার জানা। পরবর্তীতে মুঘলদের বিরুদ্ধে মুসা খান ও বারো ভূঁইয়ার জমিদারদের বিদ্রোহের ইতিহাস আমরা সবাই জানি।

পরবর্তীতে ১৭১৭ সালে বাংলায় মুর্শিদকুলী খান কর্তৃক নবাবী শাসন শুরুই হয়েছিল দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মাধ্যমে।

এরপর ইংরেজ উপনিবেশের কথা আর না বললেও চলে। ১৮৫৭ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রথম সর্বব্যাপী যে সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল, তার শুরুটাও হয়েছিল বাংলাদেশের লালবাগ কেল্লা থেকে।

আর আমাদের দেশভাগ তো ছিলই দিল্লির আর্যদের বিরুদ্ধে এক রাজনৈতিক চপেটাঘাত।
আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে দিল্লি কেন সাহায্য করেছিল, সেটা বুঝার জন্য তাত্ত্বিক হওয়ার দরকার নেই। পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরো করে দিলে সবচে বেশি লাভ তো দিল্লিরই। এমনকি বাংলাদেশের চেয়েও বেশি লাভ হবে দিল্লির। কাজেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দিল্লির অংশগ্রহণ ছিল তাদের লাভের জন্য। সুদীর্ঘ ইতিহাসের এমন কোনো প্রমাণ নেই যে বাংলার দুর্দিনে দিল্লি সহমর্মী হয়ে কখনো বাংলাকে সাহায্য করেছে।

বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের স্বৈরাচার শাসক শেখ হাসিনা যেভাবে দিল্লিকে নমঃ নমঃ করেছে, দিল্লির সামনে ষাষ্ঠাঙ্গে নতজানু হয়েছে, হাজার বছরের ইতিহাসে বাংলার কোনো শাসক এভাবে দিল্লির বশংবদ হয়নি। তিনিই প্রথম ‘বাঙালি’ শাসক যিনি দীর্ঘ ১৫ বছর দিল্লির বশ্যতা স্বীকার করে বাংলা শাসন করেছেন। আর কোনো বাঙালি শাসক এভাবে দিল্লির অধীনস্থ হয়ে বাংলা শাসন করেননি। সুতরাং তার বাঙালিত্ব নিয়ে আপনাদের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের মানুষের মনে যে ভারতবিদ্বেষ, এটা দুই-চার-পনের বছরের কোনো বিদ্বেষ না, এটা হাজার বছরের বিদ্বেষ। এটা হাজার বছরের জিওপলিটিক্যাল একটা কনফ্লিক্ট। ৩ হাজার বছর আগে আর্যরা যখন থেকে ভারতবর্ষে হিন্দুধর্ম নামে নতুন একটা ধর্ম স্টাব্লিশ করেছে, তখন থেকেই এই কনফ্লিক্ট শুরু হয়েছে।

এই কনফ্লিক্ট কখনো শেষ হবে না। দিল্লির সঙ্গে বাংলার এই কনফ্লিক্ট ও বিদ্রোহী মনোভাবই বাংলাকে বাংলাদেশ হিসেবে অভ্যুদয় দিয়েছে। এই বিদ্রোহী মনোভাবের কারণেই বাংলা অনন্য, বাংলাদেশের মানুষ অপরাজেয়। দিল্লিবিদ্বেষই বাংলাদেশের অস্তিত্বের অন্যতম রক্ষাকবচ!


Leave a Reply

Your email address will not be published.