গায়ে গতরে ভালো, দেখতে সুডৌল মসৃণ খোসার সবরি কলার দাম ৫০ টাকা হালি। দাম শুনে লজ্জা পেয়ে বৃদ্ধ কলা বেপারীর সামনে থেকে চলে আসি। সাগর কলার সামনে দাঁড়াই। ২০ টাকা হালি সাগর কলার চেহারার খোমা অতটা আহামরি না হলেও সাইজে সবরির চেয়ে দিঘল। যুবক বেপারী বললেন, বেজায় মিষ্টি। এক ফানা নিয়া যান, খায়া দাম দিবেন। আমি আশি টাকায় চার হালি কলার এক ফানা নিয়ে সবজির বাজারের দিকে এগোই।
‘কচু’ জিনিসটা কবে যে আমাদের ভাতের পাতে আবশ্যিক অনুষঙ্গ হয়ে পড়েছে, টের পাইনি। ভাতের সঙ্গে সেদ্ধ করে আঠালো ভর্তা, কিংবা মাছের সঙ্গে ঝোল—মুখী কচু নামের এই কচুটা এখন সবজি পরিবারের নিয়মিত সদস্য। হাটে-বাজারে গেলে আনতেই হয়। নানা আকারের আরও দুই-তিন পদ কচুর দেখা মেলে বাজারে। সঙ্গে কচুর ডাঁটা, পাতা আর লতি তো আছেই। বাজার দাপিয়ে বেড়ায় কচুর সকল ভেরিয়েন্ট। যে ‘কচু’ আমাদের জবানে তুচ্ছাতি হিসেবে ব্যবহার হতো—‘তুমি কচু বুঝছো’—সেই কচুর কেজি এখন ৯০ টাকা! বাজারের ব্যাগের এক কোণে আধা কেজি কচু ড্যামকেয়ার হয়ে পড়ে থাকে। যেন আমাকে বলতে চায়, তোমার মুরোদ দেখা শেষ বাহে। চলো বাড়ি যাইগা!
পেঁয়াজ-নুন, মাছ-মরিচ, আলু-বিস্কুট, নিমকি-আটাসহ প্রয়োজনীয় আরও কিছু বাজার সেরে বুকভরা আকাশ নিয়ে অটোতে উঠে বসি। হাটে আসার আগে পকেটে গোটা দুই দুই হাজারী নোট সেঁধিয়ে এসেছিলাম। বাজার সারতে সারতে দেড়টা নোট সাবাড় হয়ে যায়। কোনোদিন তাতেও কুলোয় না, পকেটে থাকে ভাংতি দু-তিনটে একশ আর খুচরো দশ-বিশ। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বুকের ভেতর জায়গা করে নেয় আকাশ সমান অভিমান। খুব অভিমান হয় পথের দিকে। সবুজ ধানক্ষেতের প্রতি। নীল-সাদা ফুলের মতো ফুটে থাকা কার্তিকের স্ফুরিত আকাশের ওপর।
মায়ের মুরগীর ছানা প্রতিদিন কমে যাচ্ছে। শিয়াল, খাটাশ, বেজি, কখনোবা ও পাড়ার বাচ্চা দেয়া মাদী কুকুরটা সদ্যফোটা দু-একটা মুরগীর ছানা নিয়ে জঙ্গলের দিকে দেয় ভোঁ দৌড়। আর হদিশ পাওয়া যায় না। মুরগীর ছানারা কমে যাচ্ছে। তিনটে মুরগী ডিম ফুটিয়ে প্রায় ২০টি ছানা তুলেছিল। সেখান থেকে এখন বড়জোর আট-দশটা টিকে আছে। শেষ অব্দি কয়টা টিকে কে জানে! অথচ মুরগী কত নিবিড় আরাধনা করে ফুটায় ছানাগুলো। দশ-বারো দিন একটানা ডিমের উপর বসে থেকে উমে উমে পৃথিবীর আলো দেখায় ছানাদের। তাদের খুঁটে খুঁটে খাওয়ায় খুদ-কুড়ো, উঠোনের পোকামাকড়। পাখনার অভয়াশ্রয়ে নিয়ে উম দেয় বিহানবেলা। গর্বিত ভঙ্গিতে শিক্ষয়িত্রীর মতো তাদের শেখায় হাঁটার কলাকৌশল।
হঠাৎ করে মাংসাশী খাটাশের থাবায় একেকটা ছানা কেমন করে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। মুরগী-মায়ের কষ্ট হয় না?
গাজায় হিংস্র পশুর থাবায় প্রতিদিন মায়ের বুক থেকে ছিটকে যাচ্ছে সন্তানের মরদেহ। শিশুর মুখ থেকে খসে যাচ্ছে মায়ের দুধগন্ধা স্তন। কাঁদতে কাঁদতে মৃত মায়ের বুকে ঘুমিয়ে যাচ্ছে অবোধ শিশু। তার ঘুম কি আর ভাঙবে?
আমাদের বাজারের ব্যাগ, মূল্যস্ফীতি, মুরগীর ছানার খবর কি পৌঁছাচ্ছে গাজার শিশুদের কাছে? তারা কি জানতে পারছে, কিভাবে আমরা ‘বুকের ভেতর বারুদ পুষে, যুদ্ধবিরোধী ছক কষছি’? আমাদের বাজারের ব্যাগ দিন কে দিন ভারী হয়ে যাচ্ছে শিশুদের রক্তঋণে। আমাদের বুক ফুলে উঠছে গভীর অভিমানে। আমাদের মোনাজাতগুলো আশাভঙ্গের বেদনায় নুয়ে পড়ছে অভিমানে, কান্নায়।
আমরা তবু হেঁটে চলি বাজারের পথে। প্রতিদিনের সংসারের চাল-ডাল, নুন-তেলের বন্দোবস্তে। যখন গাজায় প্রায় একমাস ধরে কোনো বাজার বসেনি। আমরা তবু নিরন্ত হাঁটি। কারণ আমাদের ললাটে লেখা আছে—‘পায়ে হেঁটে এসেছি, হেঁটেই ফিরে যাব’।


Leave a Reply

Your email address will not be published.