জোহরান মামদানি নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে মেয়রাল প্রাইমারি নির্বাচনে জিতে গেছেন। এইমাত্র তিনি সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ভিক্টরি স্পিচ দিলেন। ইউটিউবে লাইভ দেখলাম। হোয়াট আ মোমেন্ট!

গত কয়েকদিন ধরে জোহরান মামদানির নির্বাচনী প্রচারণার প্রচুর নিউজ এবং ভিডিও দেখেছি। তিনটা কারণে।
এক.
তিনি একজন স্বঘোষিত মুসলিম এবং একজন মুসলিম হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে তিনি দ্বিধায় ভোগেন না। তার অনেক ইন্টারভিউতে তিনি সরাসরিই নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। (এখানে একটা ট্রিকস আছে যেটা লেখার শেষে বলব।)
কয়েকদিন আগে এক ইন্টারভিউতে মামদানিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিউ ইয়র্কের মেডিসন স্কয়ারে একটি Rally করতে চান। আপনি কি তার সঙ্গে যোগ দেবেন?
তিনি সরাসরি উত্তর দেন, আমার বাবা একজন গুজরাটী মুসলিম এবং আমিও একজন মুসলিম। আমি জানি নরেন্দ্র মোদি গুজরাটে গণহত্যা চালিয়েছেন।… বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যেমন ‘ওয়ার ক্রিমিনাল’, তিনিও একই রকম ‘ওয়ার ক্রিমিনাল’।
যে কথা আমাদের মুসলিম নেতারা ডিপ্লোম্যাসির মুখোশ পরে কখনো বলতে পারেননি, সেটা মামদানি খুব অকপটে বলে দিয়েছেন।
একজন মুসলিম হিসেবে তিনি পৃথিবীর সবচে বিখ্যাত শহরের মেয়র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং সেখানকার মানুষকে অভিভূত করতে পেরেছেন, এটা তো জাদুকরী একটা ব্যাপার।
দুই.
জোহরান মামদানির প্রচারণা ভিডিওগুলোতে আমি দেখতে চেয়েছি যে তার পাবলিসিটি স্ট্র্যাডেজি আসলে কী ও কেমন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সী মামদানি প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে প্রচারণা চালিয়েছেন এবং প্রচারণার এই কয়দিনে তিনি প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের দরজায় নক করেছেন।
তিনি যেহেতু বয়সে তরুণ, নিউ ইয়র্কের তরুণ ভোটারদের একচেটিয়াভাবে নিজের দিকে নিয়ে আসতে পেরেছেন। তার প্রচারণার মূল স্লোগান ছিল: Affordable New york. পৃথিবীর বিখ্যাত শহর হওয়ায় নিউ ইয়র্কে বসবাসের ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত। কারণ পৃথিবীর সব ধনী ও বিলাসী লোকজন এই শহরে বসবাস করেন। তাই তিনি ধনীদের চপেটাঘাত করে বলেছেন, নিউ ইয়র্ক সিটিকে আমি সর্বসাধারণের জন্য Affordable বানাব।
মামদানির কথা বলা ও বক্তব্য দেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ। মানুষের সঙ্গে মেশা এবং সকল বর্ণ ও জাতির মানুষকে নিজের করে নিতে পারেন সহজে। সোস্যাল মিডিয়াকে ব্যাবহারের দারুণ ট্রিকস জানেন। এই নির্বাচনে তিনি সবচে বেশি উপস্থিত ছিলেন টিকটকে। কারণ, টিকটকে সবচে বেশি থাকে তরুণদের উপস্থিতি। তরুণদের দলে টানতে এই সহজ সমীকরণটা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন তিনি।
তিন
আমাদের দেশের তরুণ নেতাদের জন্য জোহরান মামদানি একজন আইডল হতে পারেন। বিশেষত নির্বাচনী ট্র্যাকটিসে তিনি যেসব পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছেন সেসব ট্র্যাকটিস ব্যবহার করতে পারেন।
সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আমাদের তরুণ নেতাদের অপরিপক্কতা দেখে আমি বরাবরই হতাশ হই। এরা ফেসবুকে বড় বড় লেখা আর টকশোতে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা দিয়ে নিজেদের বিরাট হাস্তি বানিয়ে ফেলেছেন। তাদের মগজে থাকা উচিত, এই সময়ের তরুণরা ৩০০/৪০০ শব্দের একটা লেখার পরিবর্তে ৩০/৪০ সেকেন্ডের একটা ভিডিও’র অধিকতর মুরিদ। টিকটক/রিলস তাদের অধিক প্রভাবিত করে।
কিন্তু আমাদের তরুণ নেতারা যেন ভিডিও করতে বড়ই লজ্জা ও দ্বিধা বোধ করেন। রাজনীতি করতে নেমে এ ধরনের দ্বিধাবোধ শংকাজনক। জোহরান মামদানির টিকটক ভিডিওগুলো দেখুন, তিনি কীভাবে স্বতস্ফূর্তভাবে নানাধর্মী ভিডিওতে হাজির হচ্ছেন। সামান্য সামান্য তরুণ কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যও ভিডিও করে দিচ্ছেন, তাদের কন্টেন্টের জন্য ইন্টারভিউ বা পোজ দিচ্ছেন। ক্রিয়েটিভ সব অ্যাঙ্গেলে নিজেকে প্রদর্শন করতে তিনি মোটেও দ্বিধায় ভুগেননি।
তরুণ নেতারা আশা করি মামদানিকে দেখে শিখবেন।
পুনশ্চ
গতকাল মামদানিকে নিয়ে একটা লেখায় আমি বলেছিলাম, ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যু পৃথিবীর সকল দেশে, বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলোতে একটা ক্লিন বর্ডার লাইন তৈরি করে দিয়েছে। তুমি হয়তো ইসরাইলের পক্ষে, নয়তো ফিলিস্তিনের পক্ষে।
এই বর্ডার লাইন পশ্চিমা সমাজে একটা বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে আমেরিকান সরকারের নতজানু ইসরাইল-নীতি আমেরিকান নাগরিকদের ক্ষুব্ধ করেছে। বিশেষত নিউ ইয়র্ক সিটির মতো বহু জাতি বর্ণ ও ধর্মের শহরের অধিকাংশ সিটিজেনকে ফিলিস্তিনের পক্ষে নিয়ে এসেছে। আর ফিলিস্তিন মানেই মুসলিম। ফলতঃ মুসলিমদের প্রতি পশ্চিমে একটা বিরাট সহমর্মিতা তৈরি হয়েছে এবং ইসরাইলের প্রতি তৈরি হয়েছে ঘৃণা।
এর মধ্যে ইরানে ইসরাইলের অযাচিত বোমা হামলা এবং ইরান কর্তৃক ইসরাইলকে সমুচিত পাল্টা জবাব পশ্চিমকে ফিলিস্তিন ও মুসলিমদের প্রতি আরেকটু সমীহ জাগাতে সক্ষম হয়েছে।
ঠিক এই সময়টাতে জোহরান মামদানি নামের একজন স্বল্প পরিচিত মুসলিম রাজনীতিবিদ যখন নিউ ইয়র্কের মেয়র ক্যান্ডিডেট হিসেবে দাঁড়ান এবং তার ক্যারিশমাটিক ক্যারেক্টার দিয়ে মানুষকে অভিভূত করেন, তখন নিউ ইয়র্কবাসী একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনে আশাবাদী হয়ে উঠে।
আর মামদানিও নিজের ‘মুসলিম’ আত্মপরিচয়কে গর্ব করে বলার ভালো একটা স্কুপ পেয়ে যান। কেননা ফিলিস্তিন তাকে এই গর্ব করে মুসলিম বলার বিরাট একটা ভূমি তৈরি করে দিয়েছে। পশ্চিমে মুসলিম পরিচয় এখন আর ইলামোফোব নয়, বরং গর্ব করে বলার মতোই একটি পরিচয়।
এভাবেই ফিলিস্তিন পশ্চিমা বিশ্বে বিরাট এক সোস্যিও-পলিটিক্যাল পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।

 

 


Leave a Reply

Your email address will not be published.