২০২২ সালে উমরা সফরের একটা নিদারুণ অভিজ্ঞতা শেয়ার করি।

আমি আর আমার সহধর্মিণী মক্কা থেকে জাবালে নুরে যাব। মধ্যবয়সী হুজুরমতো দেখতে এক ড্রাইভার দেখে এগিয়ে গেলাম, বাঙালি। ২০ রিয়ালে রফা হলো তাঁর সঙ্গে। আমাদের জাবালে নুরে নামিয়ে দিয়ে আসবেন।
ট্যাক্সিতে উঠে ড্রাইভারের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করলাম। যেহেতু বাঙালি, কথাবার্তা বললে তাঁদের থেকে অনেক অভিজ্ঞতা জানা যায়। সত্যি সত্যি এক অবাক করা অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম ড্রাইভারের পরিচয় জেনে।
তাঁর নাম ইয়াহইয়া। ৪৮ বছর ধরে সৌদি আরবে থাকেন। তিনি কথা বলেন বাংলায়, তবে তিনি বাঙালি নন, আরাকানি। মানে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁর বয়স যখন পাঁচ বছর, তখন মা-বাবার সঙ্গে সৌদি আরবে চলে এসেছেন। বিয়েশাদি এখানেই, এখানেই ঘরবাড়ি করেছেন। যদিও তিনি সৌদি আরবের নাগরিকত্ব পাননি।
‘তাহলে আপনার জাতীয়তা কী?’ জিজ্ঞেস করলাম ইয়াহইয়া ভাইকে।
‘পাকিস্তানি, আমার পাসপোর্টও পাকিস্তানি। আমার মা-বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলে এখানে এসেছিলেন। তখন পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়েই এসেছিলেন। সে হিসেবে আমারও পাকিস্তানি হিসেবে এখানে আসা। আরাকানের তো আর নিজস্ব কোনো পাসপোর্ট নেই। আর আমি তো বাঙালিও না।’ ইয়াহইয়া ভাই সহজ-সরল উত্তর দিলেন।
তাঁর কথা শুনে আমি কিছুটা স্তম্ভিত হলাম। তাহলে তাঁর দেশ কোনটা? পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার নাকি সৌদি আরব? তিনি নৃতাত্ত্বিকভাবে বার্মিজ-আরাকানি, জাতীয়তা পরিচয়ে পাকিস্তানি, বেড়ে উঠেছেন বাঙালি সংস্কৃতিতে, বসবাস করছেন সৌদি আরবে। তাঁর মাতৃভূমির পরিচয় তবে কী? তিনি কি তবে মাতৃভূমিহীন একজন মানুষ? আশ্চর্য প্রশ্ন!
দুই
এই অভিজ্ঞতা এখন শেয়ার করার কারণটা হলো, জুলাই বিপ্লবে বিদেশী শহীদ রোহিঙ্গা নূর মোস্তফা।
৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সে তার বাবাকে বলছিল, ‘আবু সাঈদ যদি জীবন দিতে পারে, আমাদের শত শত ভাই যদি জীবন দিতে পারে, আমি পারব না কেন? আপনারা পড়াশোনা করেন নাই বলে জানেন না, এই জীবন দেওয়ার দাম কত!’
সেদিন দুপুরেই কক্সবাজার ঈদগাঁ থানার সামনে নূর গুলি খায়, সেই গুলি পিঠের মাঝখান দিয়ে ঢুকে বুক দিয়ে বের হয়ে যায়। হসপিটালে নেওয়া হয়, ৬ তারিখ দুপুরে সেখানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে।
শহিদ নূর মোস্তফার বাবা শফিউল আলম মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন ১৯৯২ সালে, এরপর কক্সবাজার ইদগাঁ এলাকায় স্থায়ী বসতি গাড়েন। ১৭ বছর বয়সী শহিদ নূর মোস্তফার জন্ম বাংলাদেশেরই মাটিতে। স্থানীয় দারুস সালাম দাখিল মাদ্রাসায় ১০ম শ্রেণীর ছাত্র ছিল।
তবু শুধুমাত্র তার বাবা মা রোহিঙ্গা হওয়ায়, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায়, শহিদের তালিকা থেকে নূর মোস্তফার নাম কেটে দেওয়া হয়। কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মাননাও তার পরিবারকে দেওয়া হয় নাই। ফান্ড থেকে বঞ্চিত করা হইছে।
নূর মোস্তফা এখন এক অজ্ঞাত শহীদ। যার আত্মদানের কোনো নাম নাই, স্বীকৃতি নাই, ইতিহাস নাই। কী কারণে? কারণ তার কাছে রাষ্ট্রপরিচয়ের এক টুকরো কাগজ নাই। ‘আইডেন্টি কার্ড’ নামের এক টুকরো কাগজে তার নাম উঠেনি বলে তার জীবনদান বৃথা। জালিমের বিরুদ্ধে তার মিছিল, তার প্রতিবাদ, তার বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়া বুলেটের কোনো দাম নাই।
একজন বিদেশী শহীদের প্রতি আমাদের রাষ্ট্রের এই হলো আচরণ। অথচ আমাদের এই রাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য একমাত্র বিদেশী উইলিয়াম ওডারল্যান্ডকে ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। তাহলে নূর মোস্তফাকে ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আমাদের অনীহা কেন?
আমি রাষ্ট্রের কাছে এর জবাব চাই!

 

 


Leave a Reply

Your email address will not be published.