‘রুপান্তর’ নামে একটি টিভি নাটক নিয়ে ফেসবুকে হট্টগোল হচ্ছে। নাটকে ফারহান জোভান নামের যে অভিনেতা অভিনয় করেছেন, নাটকের পোস্টারে তার শাড়ী ও টিপ পরা ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে যত্রতত্র। পোস্টার দেখে যতটুকু আন্দাজ করা যাচ্ছে, নাটকে ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু নিয়ে দহরম মহরম রয়েছে। যেহেতু নাটকটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘একান্ন মিডিয়া’ তাদের ইউটিউব চ্যানেল থেকে সরিয়ে ফেলেছে, ফলে সেটার ভেতরে কী রয়েছে সেটা বলা যাচ্ছে না। তাই নাটকের ভেতরগত বিষয় নিয়ে কথা না বলাই উচিত। যারা দেখেছেন তারা বলতে পারবেন।
তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, অভিনেতা জোভান, নাটকের পরিচালক রাফাত মজুমদার রিংকু কিংবা নাটকের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একান্ন মিডিয়াকে নিয়ে যতটা না কথা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি চাউর হচ্ছে বাংলাদেশী ব্র্যান্ড WALTON-কে নিয়ে। কারণ, নাটকের পোস্টারে ওয়ালটনের লোগো ব্যবহার হয়েছে এবং ওয়ালটন নাটকটির স্ক্রিন-স্পন্সর করেছে। ফলে, আমরা বয়কটপ্রিয় জনতা ধুমছে আওয়াজ তুলছি, ওয়ালটনকে বয়কট করতে হবে। তাদের পণ্যাদি আর ব্যবহার করা যাবে না ইত্যাদি।
ওয়ালটনকে নিয়ে এই বয়কট বয়কট বিষয়ে খানিক চুলচেরা বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
প্রথম কথা:
ধরুন, একটি নাটক নির্মাণ করা হবে। প্রথমে একজন স্ক্রিপ্টরাইটার নাটকটির গল্প লিখেন। এরপর পরিচালক গল্পটি পছন্দ করলে তিনি সেটা নিয়ে নাটক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তিনি কোনো প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কাছে যান এবং তাদেরকে গল্প শুনিয়ে অনুরোধ করেন নাটকটি প্রযোজনা করতে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গল্প শুনে সম্মত হলে এরপর শুরু হয় অভিনেতা-অভিনেত্রী বাছাইয়ের পালা। পরিচালক ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মিলে নাটকের পাত্র-পাত্রীর প্রাথমিক তালিকা করে তাদের কাছে যান গল্প নিয়ে। তারা গল্প পছন্দ করলে তারপর ডেট ফিক্স করে শুরু হয় নাটকের শুটিং। পরিচালক, কলাকুশলী, পাত্র-পাত্রীর সম্মানী ও শুটিংয়ের যাবতীয় খরচ বহন করে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান।
নাটকের শুটিং শেষ হওয়ার পর এই নাটকটি আর পরিচালকের হাতে থাকে না। নাটকটি চলে যায় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কাছে। যেহেতু তারা নাটকটিতে অর্থ লগ্নি করেছে, সুতরাং নাটকের স্বত্ব সম্পূর্ণ তাদের। এখন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নাটকটি নিয়ে যায় কোনো টিভি চ্যানেলের কাছে অথবা কোনো ইউটিউব চ্যানেলের কাছে বিক্রি করতে। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নাটক পছন্দ করলে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সম্পূর্ণ বা আংশিক স্বত্ব কিনে নেয়। এরপর সুযোগমতো তারা নাটকটি তাদের চ্যানেল রিলিজ করে।
এই রিলিজের আগে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি থাকে টিভি বা ইউটিউব চ্যানেল কর্তৃপক্ষের। নাটকটি তাদের চ্যানেলে প্রচার করার আগে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি বা নামী কোনো ব্র্যান্ডের কাছে যায় বিজ্ঞাপনের জন্য। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ নাটকটি প্রচারের সময় ব্র্যান্ডের লোগো বা পণ্যের ছবি-ভিডিও বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে স্ক্রিনে প্রদর্শন করবে। বহুজাতিক কোম্পানি বা ব্র্যান্ড রাজি হলে তারা তাদের পণ্যের ছবি-ভিডিও প্রচারের অনুমতি দেয়। বিনিময়ে চ্যানেল কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়।
এখানেই আসে ওয়ালটন ইস্যু ও বহুজাতিক কর্পোরেট বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতা। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও সোস্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য নিজেরা সাধারণত কাজ করে না। তাদের বিজ্ঞাপন ও প্রচার-প্রচারণার জন্য তারা দেশের বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী এজেন্সিকে দায়িত্ব দেয়। এজেন্সিকে একটি লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়— এই মাসে ১০০টি নাটকে আমার এই এই পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখাতে হবে, প্রাইম টাইমে এই এই পণ্যের অ্যাড দেখাতে হবে, অমুক অমুক টিভি চ্যানেলে এত ঘণ্টা বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হবে, গুগল অ্যাড, ফেসবুক অ্যাড, ইউটিউব অ্যাডে এই পরিমাণ বিজ্ঞাপন দেখাতে হবে…।
এই সকল বিষয় দেখভালের দায়িত্ব থাকে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনী সংস্থার ওপর। মাস শেষে তারা বিজ্ঞাপন প্রচারের হিসাব দিয়ে কোম্পানি থেকে তাদের সার্ভিসের পয়সা নিয়ে নেয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো প্রতিটি অ্যাডের চুলচেরা হিসাব সাধারণত খুব একটা রাখে না। সুতরাং এই হিসাবের মধ্যে ওয়ালটনকে বলির পাঁঠা হিসেবে শুলে চড়ানোর পাঁয়তারা করা নিছক অনভিপ্রেত ছাড়া আর কিছুই নয়। না ‘রুপান্তর’ নাটকটি তারা নির্মাণ করেছে, না প্রযোজনা করেছে, আর না তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে এটিকে স্পন্সর করেছে।
বয়কট যদি করতেই হয় তবে নাটকের অভিনেতা জোভান, পরিচালক রাফাত মজুমদার রিংকু কিংবা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান একান্ন মিডিয়া বা (নাম প্রকাশ হয়নি) বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে করুন। তারা সকলে জেনে বুঝে নাটক পরিচালনা করেছে, অভিনয় করেছে, স্পন্সর করেছে এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অর্থ লগ্নি করেছে এবং ইউটিউবে প্রকাশ করেছে।
ওয়ালটন এখানে একেবারেই একটি গৌণ প্রতিষ্ঠান। নাটক নিয়ে বিতর্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ জানতোই না যে এমন একটি নাটক নির্মাণ হয়েছে এবং সেখানে তাদের অ্যাড প্রদর্শিত হচ্ছে।
দ্বিতীয় কথা:
ওয়ালটন বাংলাদেশের অন্যতম বড় ব্র্যান্ড। বিশেষত ইলেকট্রিক পণ্যে বিদেশী নামী দামী সকল ব্র্যান্ডকে হটিয়ে তারা বাংলাদেশী ব্র্যান্ডের বিশাল বাজার তৈরি করেছে। শুধু বাজারই তৈরি করেনি, তারা কম দামে মানসম্মত পণ্য বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌছে দিয়েছে। বাংলাদেশের যত প্রত্যন্ত অঞ্চলেই যান না কেন, সেখানে আপনি ওয়ালটনের কোনো না কোনো পণ্যের উপস্থিতি পাবেন। ইলেকট্রিক পণ্যে তারা এখন বাংলাদেশের এক নম্বর ব্রান্ডে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশী ব্র্যান্ড হিসেবে এটি ওয়ালটনের বিরাট অর্জন। আমরা আজ ফিলিস্তিন ইস্যুতে পশ্চিমা পণ্য বয়কটে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছি। কোক-পেপসিসহ বিভিন্ন মশহুর পণ্য বর্জন করছি। কিন্তু এসব পণ্যের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে আমাদের দেশীয় পণ্য তো থাকতে হবে। কোক-পেপসির বদলে মোজো-ক্লেমন খাচ্ছি। কিন্তু ইলেকট্রিক পণ্যের ব্যাপারে আমরা কি কখনো সচেতন হয়েছি, কোনগুলো আমাদের দেশীয় পণ্য আর কোনগুলো পশ্চিমা ও ভারতীয় পণ্য? আমরা ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিচ্ছি, কিন্তু ভারতীয় পণ্যের রিপ্লেসমেন্টে আমাদের দেশীয় ইলেকট্রিক ব্র্যান্ড কয়টা আছে? আজ যদি ওয়ালটনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়, কাল ভিশন ব্র্যান্ডকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে, পরশু আকিজ, তারপর আরেক কোম্পানি…। এভাবে বয়কট করতে করতে আমরা তো দেউলিয়া হয়ে যাব।
কাজেই বয়কট বয়কট ডাক দেয়ার আগে খানিকটা ভেবে চিন্তে কাজ করা জরুরি।
তৃতীয় কথা:
আমাদের সতর্ক থাকা জরুরি, এই ওয়ালটন ইস্যু কি আমাদের পশ্চিমা ও ভারতীয় পণ্য বর্জনের উদ্যোগকে কোনোভাবে মেনুপুলেট করছে? ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে না তো? অথবা পশ্চিমারা তাদের পাততাড়ি গুটানোর আগে আমাদের দেশীয় পণ্যকে আমাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না তো? চেষ্টাটা এমন—আমরা যেহেতু মরেছি, এই দেশীয় কোম্পানিগুলোকে সঙ্গে নিয়েই মরব! কাজেই যে কোনোভাবে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে স্পর্শকাতর ইস্যুতে মানুষের ঘৃণার পাত্র বানাতে হবে। তাদেরকেও বয়কট করার নানা ছুতা তৈরি করতে হবে।
এমনটা হতেই পারে। সুতরাং খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের বয়কট আন্দোলন যেন আমাদের জন্যই বুমেরাং হয়ে না যায়।
আনন্দের বিষয় হলো, ‘রুপান্তর’ নাটকটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ওয়ালটন কর্তৃপক্ষ তাদের স্পন্সরগত বিষয়টি ক্লিয়ার করে তাদের ফেসবুক পেজে পোস্ট করেছে। যদিও নাটকের ব্যাপারে তাদের তেমন কোনো স্বপ্রণোদিত যুক্ততা ছিল না, তবুও তারা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়টি নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করেছে। এটি তাদের সৎ উদ্দেশ্যেরই বহিঃপ্রকাশ।
কাজেই আমার মতে, ওয়ালটন ইস্যু নিয়ে অযথা বয়কটের আওয়াজ তোলা আমাদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না আদৌ। এই বিষয়ের এখানেই সমাপ্তি হওয়াটাই সবদিক থেকে ভালো হবে বলে মনে করি।


Leave a Reply

Your email address will not be published.