এই কবিতা লিখেছিলাম আজ থেকে ১০-১১ বছর আগে। কবিতাটির মধ্যে ওই সময়কার আমার প্রায় সকল কবিবন্ধুর নাম উৎকীর্ণ আছে। গুনে দেখুন তো কতজন কবির নাম আছে কবিতাখানিতে!
-একটি শহীদ কবিতা
________________________
আজকেও একটা মনোহরী কবিতার মৃত্যু হলে
কী এসে যাবে লাভ-ক্ষতি ধর্ম দোকানদারের
যে কবিতা লিখি মাঝে মাঝে
কবরচাপা দেই তার চে’ সহস্র কবিতা প্রতিদিন,
কাউকে জানাইনি সেই বেনামী শিরোনামহীনা
প্রিয়তমার নামে ছিল যার ভুলেল ডাকনাম
ইতিহাস লিখবে না সেই কবিতার সংখ্যা কোনোদিন
বুকের গোরস্তানে আঘাত-যত্নে শহীদ আমার আকিকাহীন সন্তানেরা
কী নামে ডাকব তাদের, যে কবিতা লেখা হয়নি কোনোদিন
আত্মার গর্ভে রেখেছি প্রেমহীন খড়গের গিলোটিন
হত্যার আনন্দে মাতি প্রতি ঘুম-রাত, দান পাওয়া প্রেম
শহীদ হওয়া ভালোবাসার তরতাজা একেকটা যন্ত্রণা
মহিম মাহফুজের সঙ্গে উল্লাসে বেচে দেই পায়রার হাটে
ছেলেটা কবিতা লেখে না আর;
যেমন কবি থেকে কবিতালেখক হলো আহমেদ তানভীর
শব্দের শ্রমিক বানিয়ে যাকে বনবাসে দিয়েছিল হাসন রাজা
তার কান্নার প্রতিটি অশ্রু একেকটি জলজ কবিতা, লোকটা জানে না
প্রেমহীন আকাশ ভালোবেসে, আকাশহীন নক্ষত্র ভালোবেসে
একটা নদী কবিতা লিখেছিল কীত্তনখোলা
সেই থেকে পৃথিবীর সমস্ত নদী ভয়হীন, সমস্ত নক্ষত্র প্রেমিক
নদীটা তবু খরা মৌসুমে কবিতার ভয়ে শুকিয়ে যায়
আবার প্রেমের উষ্ণতাহীন শীতের রাতে শাকীর এহসান
কবিতার নামে লিখে বেদনার বিলাপ নিকোটিন
মুঠোফোনের ঝাপসা কাচে নিঃশ্বাস লেগে আরও ঝাপসা হয়ে যায়
নোনতা স্বাদের জলের ধারা, তার বাসার নম্বর আঠারো
আমরা পাশাপাশি থাকি, রোদন শুনি না কারও
কাঠিন্যের দ্যোতনায় যেমন মরমের মহারাজা মুসা আল হাফিজ
কোকিলকে দিয়েছে জশনে জুলুছ, হাওড়ের জল মিশিয়ে তবু
আকণ্ঠ পান করেছি সেই উড্ডীন প্রেমক্লিশ অমিয় গরল
মিথ্যার আড়কে মোড়া, মুখোশের তুলতুলে গালে চুমু দিয়ে
প্রতি রাতে কবিতার রতিচ্ছেদ করে কাঙাল সাইফ সিরাজ
অথচ কী পবিত্র গালি-গালাজ আয়ত্তে আছে তার, কেন
বিরিশিরি রমণীরা প্রেমহীন রজনী কাটায় হালুয়াঘাটে, বুঝি না
কমরেড কেফায়েতভস্কি প্রতি বিকেলে প্রেমের নামে
খরচ করে ছাব্বিশ টাকা, অবরোধ আর পুলিশ বোঝে না প্রেম
হায়! কবিতার সমঝদার এসআই কেন নিয়োগ দেয় না মন্ত্রিসভা
এনায়েতের ছেলে তানভীর একবার প্রেমের জন্য দিয়েছিল অভিশাপ
তারপর থেকে ট্রান্সএশিয়ার সমস্ত মাখনরঙা কুমারীরা
পিঠে ডানা গজিয়ে উড়ে গেছে কোহেকাফ, কবিতা লেখার বদলে
সে এখন নির্মিমেষ খায় নরম বাখরখানি—শালা প্রেমিক কোথাকার!
মাঝে মাঝে প্রেম দিয়ে গালি হয়, কবিতা হয় গান
দুটোর মাঝে তফাৎ খুঁজেনি কখনো প্রকোষ্ঠবন্দী কবি মনযূর
তার দিন কাটে আজও প্রেমিকার রোদ্দুর হতে চেয়ে
হক সাব আজও কবিতা লিখে, রবি ঠাকুর পরলোকে ঢের আগে
প্রেমহীন দুর্বিষহ বয়ান দামহীন অক্লেশে সরিয়ে দিতে পারি
জীবনের সরলিকা কেন হয় না ফাতিহায়ে ইয়াজদহম
বরেণ্য ভাষার অবলীলাকে ছিন্ন করে সাত্তার আইনি
আজ বড় অচিন বালক, কোথায় যেন যাবার ছিল
নিরুদ্দেশ প্রেম টানে না একাকী প্রেমিকজীবন
শহরের পথে ফেরা সব কবি প্রেমহীন, লাজহীন, বেয়াদব
আমরণ অনশনে যাবার আগে তাই কাজী কবিটা
ছবি তুলে নিয়েছে শহরের সমস্ত রূপসী বালিকার
অভুক্ত থাকার নামই অনশন নয় হে বোকা পৃথিবী
প্রেমের বৃন্দাবনে থাকা অনশন কবি, রোকন হাপিত্যেশ
মিষ্টির দোকানে লেখা আছে তার নামের ভুল বানান
আমরা তবু সাঈদপুত্রের কবিতা পড়ে আহা উহু করি
উদ্দাম গেলাশে তার লেগে থাকে শব্দের জৈবিক আর্তনাদ
একটা প্রেমের খোঁজে শহরের সমস্ত রিকশাওয়ালা তার দোস্ত-ইয়ার
মুতীর ছেলে ভুলতে পারে না কিশোরীর আলতারাঙা পায়ের ঘ্রাণ
মাঝে মাঝে মুশফিক গেলাতে চায় দুর্বাঘাসের পাতায় রাখা হেমলক বিষ
তুহীন একদা কবিতা হতে গিয়ে বলেছিল—আত্মহত্যা মহাপাপ
অথচ তার হাতে স্থিত রক্তাক্ত সন্তান জন্মোল্লাসে কাতরায়
রুম্মান নামীয় কৃষ্ণকায় বালকের বুকে করাত চেপে করা হোক বক্ষবিদারণ
ধর্মপ্রচারের নামে নারীদের মাঝে সে প্রচার করছে যুদ্ধের গোপন ফরমায়েশ
দিব্যি ধার্মিক বনে যাওয়া খান সাদ লুকাতে শিখেছে প্রেমের অনুরাগ
আপাদমস্তক সাদী হতে হতে সাদীই রয়ে যাওয়া সাদী সুলাইমান
আরও যারা যারা; সবাই
এইসব হন্তারক কবি, আমার নিকটজন খুবই
প্রতি বসন্তের আগেই তারা খুঁজে নেয় নিরাপদ আশ্রয়
আমি তাদের সঙ্গে লুকিয়ে থাকি, আড়াল করে রাখি প্রেম ও কবিতা
নিরালায় ঘুমাই তাদের বাড়ির উঠোনের চাতালে এবং বাহবা দেই
ভালোবাসা লিখতে গিয়ে যারা ভালো ভালো শব্দ লেখে
প্রেম লিখতে গিয়ে যারা লজ্জায় রবীন্দ্রনাথের গান ভাঁজে
তারা আমার অতি আপনার ভীষণ, তারা সলাজ কবি
সুতরাং হে বোকা পাঠক! অবশেষে
তুমি একজন মিথ্যাবাদীর কবিতা পড়ছো আজকাল!