আমি জীবনে একবারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির (টিচার-স্টুডেন্ট সেন্টার) ভেতরে গিয়েছিলাম। তখন লালবাগ মাদরাসায় পড়ি। লালবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাছেই, হেঁটেও যাওয়া যায়। ছুটির দিন মাঝেমধ্যে সময় কাটাতে বন্ধুরা মিলে টিএসসি, চারুকলা, নীলক্ষেত, বুয়েট ইত্যাদি এলাকায় বেড়াতে যেতাম। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের পরিচিত দু-একজন বড়ভাই ছিলেন, তারাও কখনো থাকতেন সঙ্গে।

এমনই একদিন চারুকলায় একটি আর্ট এক্সিবিশন দেখার পর ফিরতি পথে মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় আমাদের এক বড়ভাই বললেন, টিএসসির ভেতরে নামাজের ব্যবস্থা আছে। তার সঙ্গে ভেতরে গিয়ে পশ্চিম পাশের কোন একটা ভবনের বারান্দায় মাগরিবের জামাতে শরিক হলাম।
ওই একবারই টিএসসির ভেতরে যাওয়া হয়েছিল। বিগত জীবনে আর কখনো টিএসসির ভেতরে-বাইরে যাওয়া বা সেখানে বসে আড্ডা মারার সুযোগ হয়নি।
সম্প্রতি বন্ধুজন Bashirul Amin-এর ফেসবুক পোস্ট পড়ে ঘটনাটি মনে এলো। টিএসসিতে যাওয়া না-যাওয়ার সঙ্গে বাশিরুল আমিনের সাম্প্রতিক লেখার পরোক্ষ তেমন কোনো সংযোগ নেই বটে, কিন্তু জীবনে লেখালেখি করতে গিয়ে একটা জিনিস খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি—আপনি যত ভালোই লেখেন না কেন, কিংবা লেখক হিসেবে যতই জনপ্রিয় হন না কেন, আপনার শরীরে যদি মাদরাসার ঘ্রাণ আর পোশাকে টুপি-পাঞ্জাবি থাকে, টিএসসি ও শাহবাগকেন্দ্রিক বাংলাসাহিত্যের কথিত ধ্বজাধারীরা কখনোই আপনাকে লেখক হিসেবে একসেপ্ট করবে না।
এই সত্য লেখালেখি জীবনের একদম শুরুর দিকেই বুঝতে পেরেছিলাম বলে আমি কখনো কথিত ধ্বজাধারীবৃন্দের বিচি ধরে ঝুলতে যাইনি। আমি কখনো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যাইনি, বাতিঘরেও গিয়েছি জীবনে একবার চিটাগং বেড়াতে গিয়ে, বইমেলায় যেতে আমার ভীষণ বিরক্ত লাগে, ফরহাদ মাজহারের বৈঠক বা যে কোনো সাহিত্য আড্ডা ফাড্ডা শুধুই কচকচানি মনে হয়। এইসব করে সাহিত্যের তকমা ধার করার কোনো ইচ্ছাই আমার কখনো হয়নি। আমি নিজেই নিজের স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেছি।
সাধারণ শিক্ষিত বহু বিদ্বান ব্যক্তি আমার লেখা পড়ে মন্তব্য করেন, মাদরাসার ছেলে হয়ে আপনি এত ভালো লিখতে পারেন, এটা তো অবিশ্বাস্য। আমি মনে মনে তাদের সুধাই, আমার লেখার মূল্যায়নের জন্য ‘মাদরাসা’ যেমন কোনো প্রতিবন্ধক নয়, তেমনি জেনারেল শিক্ষিত বিদ্বানদের সার্টিফিকেটও আমার জন্য বড় কোনো অনুপ্রেরণা নয়।
আমার লেখালেখির সবচে বড় অনুপ্রেরণা আমার মাদরাসা ব্যাকগ্রাউন্ড এবং আমার সেইসব টুপি-পাঞ্জাবিপরা পাঠকগোষ্ঠী—যারা আমাকে নিয়ে শত টিপ্পনী করার পরও শুধু আমি তাদের স্বগোত্রীয় বলে তারা আমার সকল অর্জনে গর্ববোধ করে। আমি সর্বসম্মতিতে তাদেরই একজন হয়ে থাকতে চাই।
আমি কখনো আমার শরীর থেকে মাদরাসার ঘ্রাণ আর টুপি-পাঞ্জাবি যেমন ঘষে মেজে তুলে ফেলতে চাই না, তেমনি আমি ‘বিরাট পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌছানো’র অলীক বাসনায় তিল তিল করে আমাকে লেখক হিসেবে গড়ে তোলার নেপথ্যে থাকা এই পাঠকগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র ভাবতে চাই না।
আমাকে নিয়ে যতই বদনাম হোক, এই বদনামী পাঠকেরাই দিনশেষে আমার প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয় এবং আমার সঙ্গে গৌরবের ভাগীদার হয়।
বিরাট বড় মহান লেখক হওয়ার তেমন কোনো পোক্ত এরাদা নাই আমার।

আমি শুধু রবি ঠাকুরের পঙক্তি আওড়াতে চাই:

মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক

আমি তোমাদেরই লোক


Leave a Reply

Your email address will not be published.