বড় ক্ষুদ্র এ জীবন। সেই যে কবে যেন একটা কোকিলের কুহু শুনে অনেকক্ষণ কান পেতে ছিলাম। একটা সোনালু ফুলগাছের দিকে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে কী যেন ভেবেছিলাম, এখন আর মনে নেই। শুধু মনে আছে, উদ্বেল হলুদ রঙের সোনালু ফুলের মাঝে যদি একটা সবুজ পাতা হয়ে লুকিয়ে থাকতে পারতাম! তারপর একদিন কমলা রং হয়ে ঝরে পড়তাম কোনো চৈতালি বাতাসে। পথে অথবা পথের পাশে কোনো ঘাসের গায়ে। বৈশাখী ঝড়ে উড়ে যেতাম, অথবা পচে-গলে মিশে যেতাম মাটির সঙ্গে।
ওইটুকুই তো জীবন। আমি তো ক্ষুদ্র এক পাতা। বুকে ধারণ করছি সবুজের স্মৃতি, সুন্দরের স্মৃতি, কোনো অব্যক্ত ফুল আর কোকিলের মুগ্ধতা জমা করছি মস্তিষ্ক ও মননের গহিনে। স্মৃতির সরঞ্জামের নিচে চাপা পড়ছে আরও কিছু পুরোনো স্মৃতি। ভুলে যাচ্ছি কিছু, কিছু দাগ রয়ে যাবে অনিমেষ। সব দাগ সয়ে সয়ে মন ও শরীরে পড়বে বাদামি রঙের বলিরেখা। তারপর টুপ করে একদিন হাওয়ার সঙ্গে আমারও শেষ নিশ্বাস মিলিয়ে যাবে ইথার শূন্যে। আর কোনো দিন তাকে ফারাক করা যাবে না হাওয়ার ঢেউ থেকে। মহাকালের অনিন্দ্য মিছিল থেকে হারিয়ে যাব চিরকালের জন্য।
আমি ভাবি, আমার মৃত্যুর পর আমার নাম-যশ-খ্যাতিতে কী আসে যায়! অথচ দেখো, দুনিয়া কেমন পাগল নাম-খ্যাতির জন্য, যশ আর পপুলারিটির অপছায়ায় সবাই কেমন বুঁদ এখন। নায়ক থেকে নেতা, প্রেমিক থেকে কৃষক, সুন্দরী থেকে লেখক, আল্লামা থেকে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা—সবাই কেবল অঢেল খ্যাতি চায়। নিজের নাম উৎকীর্ণ করতে চায় কোটি মানুষের মুখে, মনে। সেলিব্রেটি তকমা লাগানোর হুল্লোড় চারদিকে, ভাইরাল হওয়ার মোহ প্রগাঢ়।
সৃষ্টির বিরাটত্ব এবং চিন্তার বিশালতা সম্ভবত আমাদের জীবনের ক্ষুদ্রতা অনুধাবনের সবচেয়ে সহজ সবক। যদি আমরা ভাবি, আল্লাহ এ বিশাল মহাবিশ্ব কী সুনিপুণ তরিকায় নিয়ন্ত্রণ করছেন। শত-সহস্র নক্ষত্রপুঞ্জ নিয়ে তার কাজ-কারবার। সেখানে আমরা অখ্যাত এক গ্যালাক্সির অন্তরালে পড়ে থাকা ক্ষুদ্র এক গ্রহের গুটি কয়েক সৃষ্টি জপছি তাঁর নামের তসবিহমালা। আল্লাহ, তুমি কি আমাদের শুকরিয়াধন্য কাতরধ্বনি শুনতে পাচ্ছ?
আল্লাহ শুনছেন। বৈশাখী অমাবস্যায় নিভৃত অরণ্যের মাঝে ঘাসের অলিন্দে হাঁটছে যে একাকী পিঁপড়ে, তিনি তার তন্তুসম পায়ের আওয়াজও শুনতে পান। চিন্তা করো, কী অবিশ্বাস্য প্রকৌশলী তিনি। তাঁর প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের সামনে আমরা কতটা ক্ষুদ্র, কখনো চিন্তা করেছ?
এই ক্ষুদ্রতার অনুধাবনই মানবজন্মের মহত্ত্ব, আল্লাহওয়ালা হওয়ার প্রথম সবক। নিজেকে বিরাট কিছু নয়, ক্ষুদ্র একটা পাতা হয়ে নিস্তরঙ্গ তরঙ্গায়িত হওয়ার মতো ক্ষুদ্র, পায়ে পিষে ফেলা একটা পোকার মতো, জলের স্রোতে ভেসে যাওয়া কচুরিপানার মতো নিঃসম্বল ভাবতে পারব যখন—তখনই আমাদের যাত্রা শুরু হবে অবিনশ্বর বিশালতার দিকে।
নিজেকে ক্ষুদ্র করতে না পারলে তুমি কখনো বিশাল হতে পারবে না।
পুস্তক: এ জীবন পুণ্য করো (খরিদলিংক কমেন্টে)