বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকালে আমার বারবার শুধু ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান (রা.)-এর মৃত্যু পরবর্তী উত্তাল সময়ের কথা মনে পড়ে। বাংলাদেশে এখন যে অবস্থা, খলিফা উসমানের মৃত্যুর পরও ঠিক তেমনই একটা অবস্থা বিরাজ করছিল।
একদল অতি উৎসাহী ও ভুল ইনফর্মড মানুষের আক্রমণে তিনি শহীদ হলেন। তিনি শহীদ হওয়ার পর মদিনার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ হজর আলি (রা.)-কে চতুর্থ খলিফা নির্বাচন করলেন।
কিন্তু তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরু হলো দ্বিমুখী সংকট। ইসলামি রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় একদল ব্যক্তি দাবি জানালেন, নতুন খলিফাকে সর্বপ্রথম শহীদ উসমান হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে হবে, তারপর বাকি সব। দ্রুত তার হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে ও তারা সংঘটিত হওয়ার সুযোগ পাবে এবং মুসলিম জনমনে প্রবল অসন্তোষ সৃষ্টি হবে।
খলিফা আলি (রা.) এবং আরেক দল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সিদ্ধান্ত ছিল, আগে নানামুখী সংস্কারের মাধ্যমে প্রশাসন শক্তিশালীকরণ এবং দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়া বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে নিষ্ক্রিয় করতে হবে। নইলে খলিফা উসমানের (রা.) হত্যাকাণ্ড একটি শুরু মাত্র, এমন হত্যাকাণ্ড নিকট ভবিষ্যতে আরও সংঘটিত হতেই থাকবে। শহীদ খলিফা উসমানের বিচারপক্রিয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া।
তার পরের ইতিহাস আপনারা অনেকেই জানেন। এই দুই বিবদমান দাবি নিয়ে আয়েশা (রা.) ও মুআবিয়া (রা.) খলিফা আলির বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণা দেন। মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ জঙ্গে সিফফিন ও জঙ্গে জামাল সংঘটিত হয়। বিরাট সংখ্যক সাহাবি রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন।
পরবর্তীতে বিচ্ছিন্নতাবাদী খারেজি ও পারস্যকেন্দ্রিক কিছু চরমপন্থী দলের উদ্ভব ঘটে। ফলশ্রুতিতে কয়েক বছর পর খলিফা আলি (রা.) শাহাদাত বরণ করেন।
এই ঘটনার লিগ্যাসি সেখানেই শেষ হলো না। আরও কয়েক বছর পর আলিপুত্র হাসান (রা.) বিষক্রিয়ায় শাহাদাত বরণ করলেন। কিছুদিন পর ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক কারবালার ঘটনার মধ্য দিয়ে আলিপুত্র হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারের নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
এই ইতিহাস পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, খলিফা উসমান ও খলিফা আলির ক্ষমতা ট্রানজিশনের সংকটকালে সবচেয়ে প্রয়োজন ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসিকতা। ওই সংকটকালে নানা পারিবারিক ও গোত্রীয় সীমাবদ্ধতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে যদি সকলের ঐক্যমতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত, তাহলে ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়গুলো অনেক বেশি স্বর্ণালি, অনেক বেশি রুপালি এবং অনেক বেশি সবুজ কালি দিয়ে দিয়ে লেখা যেত। কিন্তু দুঃখ আমাদের, সেই ইতিহাস আজ আমাদের পড়তে হয় কেবলই লাল রক্তের অক্ষরে।
***
আমরা চাই না জুলাই আমাদের এই মাতৃভূমিতে কোনো নব্যকারবালা হয়ে ফিরে আসুক। আমরা জুলাই ২৪-এ বাংলার কারবালা প্রান্তরে এক ফোরাত রক্তনদী পেরিয়ে এসেছি। আমরা নতুন আর কোনো কারবালা চাই না। আমরা আর কোনো আলি, হাসান, হোসাইনের শাহাদাত চাই না। আমরা চাই না ইতিহাসে মুসলিমের রক্তরাঙা আর কোনো জঙ্গে জামাল বা জঙ্গে সিফফিন ফিরে আসুক।
তাই এই দেশের রাজনৈতিক নেতা যারা আছেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার তরে আত্মদানে বলীয়ান জনতা যারা আছেন, দেশের অতন্দ্র প্রহরী সৈনিক যারা আছেন, এবং আবশ্যিকভাবে জেগেওঠা তরুণ তুর্কী যারা আছেন, যাদের ত্যাগে এই দেশে নতুন সূর্য উদিত হয়েছে; সাধারণ খেটেখাওয়া জনগণ হিসেবে আপনাদের সবার কাছে আমাদের আকুল আবেদন, আপনারা খেলাফতের সংকটকালের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন। ইতিহাস আপনাদের সবচেয়ে গুড লেসনটা শিক্ষা দেবে।
প্রবাদ আছে, ‘ইতিহাস এটাই শিক্ষা দেয় যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।’
এই প্রবাদটা সর্বোতভাবে একটি ভুল প্রবাদ। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছিল বলেই সর্বপ্রথম আগুন প্রজ্বলন করা মানুষ পরবর্তীতে বিদ্যুৎ আবিষ্কার করতে পেরেছিল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েছিল বলেই পাহাড়ের গুহায় ঘর বানানো মানুষেরা সহস্রাব্দ পরে একদিন আকাশচুম্বী অট্টলিকা বানানোর প্রাযুক্তিক জ্ঞান অর্জন করেছিল। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার কারণেই আজ আমাদের সভ্যতা টিকে আছে। নইলে আজও আমাদের জীবন কাটাতে হতো প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মতো।
সুতরাং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিন। ইতিহাস হবে আপনার সবচেয়ে নিরহংকারী শিক্ষক, নিজেকে নিংড়ে দেওয়া পরামর্শদাতা। মনে রাখবেন, ইতিহাস কখনো ভুল শিক্ষা দেয় না।