উম্মে হারাম বিনত মিলহান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (কুবা মহল্লায়) আমার নিকটবর্তী একস্থানে শুয়েছিলেন। এরপর জেগে উঠে তিনি মুচকি হাসতে লাগলেন। আমি বললাম, আপনি হাসলেন কেন? তিনি বললেন, আমার উম্মতের এমন কিছু লোককে আমার সামনে উপস্থিত করা হলো যারা নীল সমুদ্রে আরোহণ করেছে, যেমন বাদশাহ সিংহাসনে আরোহণ করে।
উম্মে হারাম (রা.) বললেন, আল্লাহর কাছে দু’আ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি তার জন্য দুআ করলেন। এরপর তিনি দ্বিতীয়বার নিদ্রা গেলেন এবং আগের মতই আচরণ করলেন। উম্মে হারাম আগের মতোই বললেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগের মতোই জবাব দিলেন। উম্মে হারাম (রা.) বললেন, আল্লাহর কাছে দুআ করুন তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৯৯৯)
মদিনার খাজরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখাগোত্রের মহিয়সী নারী উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)-এর মূল নাম কী ছিল, জানা যায়নি। তবে তার পরিচিতির জন্য তিনটি পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। এক. তিনি আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর খালা ছিলেন, অর্থাৎ উম্মে সুলাইম (রা.)-এর বোন। দুই. তিনি প্রখ্যাত সাহাবি উবাদা ইবনে সামিত (রা.)-এর স্ত্রী ছিলেন। তিন. তিনি প্রথম মুসলিম নারী যিনি মুসলিমদের প্রথম নৌবাহিনীতে শামিল ছিলেন।
খলিফা উমর (রা.)-এর খেলাফতকালীন সিরিয়ার প্রশাসক মুআবিয়া (রা.) খলিফার কাছে প্রথম আবেদন করেন মুসলিমদের একটি নৌসেনাদল গড়ে তোলার। কারণ মুসলিম সেনাদল সে সময় বাইজাইন্টাইন ও রোমীয়দের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। পরাজিত অনেক বাইজান্টাইন ও রোমীয় সেনাবাহিনী আশ্রয় নিতো দুর্গম সাগর উপদ্বীপ সাইপ্রাসে (কুবরুস)। সেখানে তারা নতুন করে সৈন্য সমাবেশ করে আবার পূর্ণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসতো। কিন্তু সাইপ্রাসে হামলা করতে হলে নৌবাহিনী ছাড়া ভিন্ন কোনো উপায় নেই। তবে খলিফা উমর সামরিক ও ভৌগলিক নানা কারণে সে সময় মুসলমানদের নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি দেননি।
উমরের শাহাদাতের পর মুআবিয়া (রা.) একই দাবি নিয়ে পরবর্তী খলিফা উসমান (রা.)-এর কাছে যান। খলিফা উসমান তার প্রস্তাবনায় সায় দেন এবং মুআবিয়া (রা.) প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গড়ে তুলেন। তার এই নৌবাহিনীতে শামিল হন প্রথিতযশা সাহাবিরা। যেমন উবাদা ইবনে সামিত, মিকদাদ ইবনে আল-আসওয়াদ, আবু জর গিফারি, শাদ্দাদ ইবনে আওস, খালিদ ইবনে যায়েদ আল-আনসারী এবং আবু আইয়ুব আল-আনসারীর মতো ব্যক্তিগণ।
মুআবিয়া (রা.) তার নৌবাহিনীতে কয়েকজন নারীকেও যুক্ত করেন। তাদের একজন ছিলেন উবাদা ইবনে সামিত (রা.)-এর স্ত্রী উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)। তিনি একজন দক্ষ নার্স ছিলেন। উহুদ, হুনাইনসহ বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি নার্স হিসেবে নিজের পারদর্শিতা দেখান। এ কারণে তিনি তার স্বামীর সঙ্গে প্রথম মুসলিম নৌবাহিনীর প্রথম অভিযানে শরিক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এই অভিযানে মুআবিয়ার স্ত্রী কাতওয়া বিনতে কারাজাও শামিল ছিলেন।
মুআবিয়া (রা.) ২৭ হিজরিতে নবগঠিত মুসলিম নৌবাহিনী নিয়ে সাগর দ্বীপ সাইপ্রাস আক্রমণ করেন এবং সাইপ্রাস বিজয় করতে সক্ষম হন। সাইপ্রাস বিজয় শেষে সেখান থেকে ফেরার পথে উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.) ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে ভীষণ আঘাত পান এবং এই আঘাতে সাইপ্রাসেই মৃত্যুবরণ করেন।
সাগর দ্বীপ সাইপ্রাসের মাটিতে দাফন করা হয় প্রথম মুসলিম নারী নৌসেনা উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)-কে। হিশাম ইবনে আল গায বলেন, আমি ৯১ হিজরিতে বাকাকীস সাগর উপকূলের সাইপ্রাসে তার কবর দেখেছি এবং তার পাশে দাঁড়িয়ে দুআ করেছি।
সাইপ্রাসে এখনও ‘হালা সুলতান টেক্কে’ নামে উম্মে হারাম বিনতে মিলহানের কবর ও কবরের পাশে একটি মসজিদ রয়েছে।