জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যারা কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হয়েছেন, আমরা তাদেরকে ‘ফেরেশতার’ কাতারে দেখতে চাই। তাদের কোনো ভুলচুক হওয়া যাবে না। কি ব্যক্তিগত জীবনে, কি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। অতীত হোক কিংবা বর্তমানে। তারা হবেন সাহাবি আবু বকরের (রা.) মতো সচ্চরিত্রবান, উমরের (রা.) মতো সাহসী, উসমানের (রা.) মতো বিনয়ী, আলীর (রা.) মতো অমিততেজা, উমর ইবনে আবদুল আজিজের (রা.) মতো ন্যায়নিষ্ঠ, মুঈনুদ্দিন চিশতির মতো দুনিয়াবিমুখ।
আমরা হয়তো মনে মনে নাগরিক পার্টির নেতাদেরকে এমন তবকাতেই বসিয়ে দিয়েছি। ফলে তাদের কোনো ভুল-ভ্রান্তি যখন আমাদের চোখের সামনে আসে, আমরা তাদের ছাল তুলতে সামান্য কসুর করি না। যেন আমরা ধরেই নিয়েছি, এই নেতাদের থেকে এমন এমন ভুল ভ্রান্তি কেন হবে? কেন তারা ফেরেশতার কাতার থেকে মানুষের কাতারে নেমে আসবেন?
মনে রাখা দরকার, নাগরিক পার্টির অধিকাংশ নেতার বয়সই এখনও ৩০ পেরোয়নি। এই বয়সে আমি-আপনি এখনও সারাদিন ফোন, বন্ধু-বান্ধবী, গেম-স্পোর্টস, নাইট পার্টি, টিকটক-রিলস নিয়ে ব্যস্ত। অথচ তারা একটা বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়ে জগদ্দল পাথরের মতো স্বৈরাচার শাসনকে বিতাড়িত করেছেন।
এতটুকু করেই তারা ক্ষান্ত হয়ে যাননি। ইচ্ছা করলেই মায়ের ছেলেরা মায়ের কোলে ফিরে যেতে পারতেন। আটটা-পাঁচটার চাকরি বা ছোটখাটো কোনো ব্যবসায় লেগে মা-বাবা আর বউ-সংসার নিয়ে দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তারা বিপ্লব করেই ক্ষান্তি দেননি। হাজার শহীদ আর হাজারো আহত বিপ্লবীর আত্মত্যাগের দায়ভার নিজেদের কাঁধে তুলে তারা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর হয়েছেন। তারা কারো ভরসায় বিপ্লবকে অসমাপ্ত রেখে পিছিয়ে আসেননি। বরং শত বিপত্তি আসবে জেনেও নিজেদের সর্বস্ব বাজি রেখে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের ভিত্তি দিয়েছেন। এই দেশে লাখো-কোটি তরুণের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে তারা নিজেদের তারুণ্যের সকল উল্লাসকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন।
তাদের ভুল-ভ্রান্তিই শুধু দেখবেন কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ আর অবদানকে বিচার করবেন না, এটা তো অবিচার। যে দেশে দশকের পর দশক ধরে মানুষের মনে সামান্যত আশার আলো ছিল না। দেশের উন্নয়নে যে দেশের মানুষ ভোট দেয়া তো দূরের কথা, সামান্য পার্টিসিপেটও করতে পারতো না, সেই দেশে তারা মানুষের সকল নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেবার অঙ্গীকার করেছেন। তাদের এই অবদানকে তো অস্বীকার করতে পারবেন না। এখন তো অন্তত আমরা দেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখার সুযোগ পেয়েছি। বিগত দশকগুলোতে যেখানে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির ফলে সেই সুযোগও আমাদের ছিল না, সেখানে তারা আমাদের দেশ গড়ার অধিকার এনে দিয়েছেন।
সুতরাং ভুল-ভ্রান্তি হলেই তাদের সকল অবদানকে অস্বীকার করার যে মানসিকতা আমাদের তৈরি হয়েছে, এটা উচিত নয়।