আনিসুল হক বা সাদাত হোসাইন তো কওমি মাদরাসা বা মহিলা মাদরাসার শিক্ষার্থীদের নিয়ে লিখবেন না। লিখতে পারবেনও না। কারণ মাদরাসার অন্তর্গত পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিষয়ে তাদের তেমন কোনো ধারণাই নেই। তাই তারা যখন মাদরাসা/মাদরাসা শিক্ষার্থীদের নিয়ে লিখতে যাবেন, তাদের জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে হয়তো নেগেটিভলি লিখবেন, নয়তো তাচ্ছিল্যাকারে লিখবেন।
দোষ আসলে পুরোপুরি শুধু তাদেরও দেয়া যায় না। দোষ আমাদেরও আছে। আমরা মাদরাসা নিয়ে কয়টা উপন্যাস বা গল্পের বই লিখেছি? হতেগোনা এক বা দুইটা। তাহলে মাদরাসা নিয়ে সাধারণ্যের মাঝে ধোঁয়াশা, অতিচিন্তা এবং নানা মিথ তো তৈরি হবেই। আমাদের মাদরাসাগুলোতে ভীষণ রেস্টিক্টেড এরিয়া। সাধারণ মানুষের সেখানে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ নেই। ফলে সাধারণ্যের মাঝে মাদরাসা নিয়ে অতিচিন্তা এবং কৌতূহল তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষত মহিলা মাদরাসা নিয়ে মিথের শেষ নেই।
মহিলা মাদরাসা মানেই সমাজের কাছে মনে হয় যেন এক পাতালপুরীর অজানা কাহিনি। নিষিদ্ধতায় টইটম্বুর এক জীবনযাপন করে সেখানকার মেয়েরা। কালো বোরকার আড়ালে তারা নিছক বন্দিনিবাসী। শিক্ষিতশ্রেণির লোকজন তো মনে করে, মহিলা মাদরাসাগুলোতে পড়তে আসা বালিকারা নানা প্রকার অমানবিক পরিবেশে বেড়ে উঠছে। সেখানে তারা পড়তে পড়তে হয়ে উঠছে ধর্মীয় ফ্যানাটিক বা এক্সট্রিমিস্ট ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিন্তু এইসব মিথ ও মিথ্যার আড়ালে মহিলা মাদরাসার মেয়েরাও তো মেয়ে। তারা আর দশজন মেয়ের মতোই দুঃখ পায়, ভালোবাসে, বন্ধুত্বের জন্য বেকারার হয়। বড় বড় কিতাব-পুস্তক পড়ার ফাঁকে পরিবারের জন্য হাহাকার করে হৃদয়। বাড়িতে রেখো আসা মায়ের জন্য মন পুড়ে। ছোট ভাই-বোনের জন্য চোখ টাটায়। রাত্রিতে ঘুমানোর আগে তারাও স্বপ্ন দেখে। কখনো সন্তর্পনে মনের মধ্যে পাখনা মেলে মেয়েলী কত চিন্তা, ছোট্ট একটা স্বামী-সংসার-সন্তানের ছায়াছবি।
কেবলই বোরকার আড়াল আর প্রতিবন্ধকতার ঘেরাটোপ দিয়ে তাদের একঘরে করে রাখা আমাদের অন্যায় চিন্তা। তাদের অনুভব-অনুভূতি আর মানবিক হৃদয়কে অবজ্ঞা করে শুধু তাদের ‘মহিলা মাদরাসা’ পরিচয় দিয়ে বিচার করার যে মানসিকতা আমরা তৈরি করেছি, এটা অবিচার।
#পর্দানশিন নামের যে গল্পগ্রন্থ আমি লিখেছি, এ গ্রন্থের প্রায় সবগুলো গল্পই মহিলা মাদরাসাকেন্দ্রিক। মহিলা মাদরাসার অন্দরে বেড়ে ওঠা মেয়েদের প্রতিদিনকার জীবন ও অনুভব আমি গল্পের চরিত্র ও পরিবেশে তুলে আনতে চেষ্টা করেছি। আমি তাদেরকে অতিমানবী হিসেবে চিত্রিত করতে চাইনি, আবার তাচ্ছিল্যের বাক্যবানেও তাদের জর্জরিত করিনি। আমি জাস্ট আমাদের সমাজের আর দশজন কিশোরী-তরুণী হিসেবে তাদের উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি পাঠকের সামনে। তাদেরও যে জীবন আছে, সেই জীবনটাও গল্প হতে পারে–এটাই ছিল আমার প্রচেষ্টা।