বাংলা সাহিত্যের একটা বড় ছন্দপতন—সাহিত্য গ্রাম ছেড়ে নগরমুখী হয়েছে এবং তৃণমূল চারণ কবিদের স্থান দখল করেছেন শিক্ষিত লেখক-কবি শ্রেণি। এখন কবি-লেখক বলতেই শিক্ষিত হওয়া বাঞ্চনীয়। যিনি শিক্ষিত নন বা যার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ঘাটতি রয়েছে, তিনি কবি বা লেখক হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন না। বিগত ৫০ বছরে বাংলা সাহিত্যে এমন উদাহরণ নেই বললেই চলে—যিনি শিক্ষিত নন কিন্তু গান বেঁধে বা কবিতা লিখে বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। এটা সামগ্রিকতার বিচারে আমাদের সাহিত্যকে একক কেন্দ্রীভূত করে ফেলেছে। এবং এটা শংকার কথা।
কিন্তু হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবিদের সঙ্গে শিক্ষার তেমন কোনো সম্পর্ক ছিল না। যার হৃদয়জ ভাব-ব্যঞ্জনা তীক্ষ্ণ ও গভীর হতো, তিনিই কবি হতে পারতেন। যার পুঁথি ও গান বাঁধবার সৌকর্য থাকতো, তিনি হতেন অত্রাঞ্চলের প্রথিতযশা কবি-গায়েন। এর জন্য নগর বা রাজধানীর প্রয়োজন হতো না। প্রতিটি গ্রামীণ জনপদে বিরাজ করতেন কবিগণ। সন্ধ্যা হলেই পাড়া-মহল্লায় জ্বলে উঠতো হ্যাজাক বা মশাল বাতি। হল্লা করে স্বরচিত পুঁথিপাঠ হতো। এক গ্রামের কবিগণ পালা লড়তে যেতেন আরেক গ্রামের কবিদের সঙ্গে। এদের তেমন কোনো আক্ষরিক বিদ্যাজ্ঞান থাকতো না। মুখে মুখে শত শত—অনেকে হাজার হাজার কবিতা-পুঁথি-গীতি মুখস্থ বলতে পারতেন।
একটা সময় বাংলা সাহিত্য বলতে ছিল কেবলই কবিতা ও পুঁথি, গান বা গীতিকবিতা। এগুলো কবিদের মুখে মুখে তৈরি হতো এবং হৃদয়ঙ্গম করার মাধ্যমে সেটির স্থায়িত্ব লাভ হতো। ছন্দোবদ্ধ কবিতা তৈরি এবং হৃদয়ঙ্গম করা সহজ। যার দরুণ কবিতা যেমন কবিদের মুখে মুখে তৈরি হতো, তেমনি সেগুলো ছড়িয়েও পড়ত মানুষের মুখে মুখে। কবিতার লেখ্যরূপ ছিল নিতান্ত দুষ্প্রাপ্য। ফলে, মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে যে কবিতা ও গান যত বেশি ব্যবহৃত হতো, সেটা তত বেশি প্রসার লাভ করত এবং স্থায়িত্ব লাভে সেটার সুযোগ বেশি হতো।
গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে সাহিত্য নগরের দিকে যাত্রা করে। এর প্রধান কারণ আমার মনে হয়েছে—কাগজ ও ছাপার সহজলভ্যতা। এ দুটো জিনিস যেহেতু অক্ষর ও শিক্ষাকে ধারণ করে, ফলে সাহিত্য গ্রামের সাধারণ মানুষের মুখ থেকে শিক্ষিতশ্রেণির কাগজে উঠে এসেছে। ফলে অধুনা এক শ বছরের মধ্যে গ্রাম থেকে সাহিত্য পুরোপুরি বিদায় নিয়েছে। যাদের অক্ষরজ্ঞান নেই বা যারা যথেষ্ঠ শিক্ষিত নয়, তাদের জন্য বাংলা সাহিত্যের এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আরেকটি কারণ হলো, সাহিত্যের নতুন নতুন ধারার উদ্ভব। এটি অবশ্য ছাপার সহজলভ্যতার কারণেই হয়েছে। যেমন গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, গবেষণাপত্র এবং ছাপা অক্ষরে মুদ্রিত সকল আক্ষরিক দস্তাবেজই মৌখিক গ্রামীণ সাহিত্যের জন্য অশনি হয়ে প্রতিভাত হয়েছে।
আমাদের ছোটবেলায় পুঁথিপাঠ ও মৌখিক সাহিত্যের খানিকটা রেওয়াজ ছিল, কিন্তু বর্তমানে এই ধারা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এরই সঙ্গে বিলোপ হয়েছে হাজার হাজার পুঁথি, লোকগান, রূপকথা, মিথ এবং অসংখ্য সাহিত্যকর্ম। এসবের স্থানে জায়গা করে নিয়েছে জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন, মাসুদ রানার থ্রিলার আর ডিসি-মার্ভেলের আজগুবি কমিক-চরিত্র। এসবই নগরকেন্দ্রিক সাহিত্যের বড় বড় মারণাস্ত্র।
নগরমুখী সাহিত্য-প্রবণতা বাংলা সাহিত্যকে লৌকিক আভিজাত্য দিয়ে হত্যা করেছে সহস্র বছরের ঐশ্বর্যময় মানবিক সাহিত্যকে।
তো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো গ্রাম থেকে সাহিত্য নগরে এসে আশ্রয় নিয়েছে, কিন্তু গ্রামের সেই প্রাচীন কবিতা ও গানকেন্দ্রিক সাহিত্য ঠিকই কোনো না কোনোভাবে নগরে তার প্রভাব শক্তভাবে প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। যে সাহিত্য হাজার বছর ধরে মানুষকে প্রভাবিত করে এসেছে, তার প্রভাব এত সহজে ম্লান হবার নয়।


Leave a Reply

Your email address will not be published.