ছেলেটার বয়স এখনও বিশ পেরোয়নি। কয়েকদিন আগের শেভ করা দাড়ি-গোঁফ অল্পই গজিয়েছে গালের এখানে সেখানে। গৌর বরণ। বিলে বিলে ঘুরে রোদপোড়া ধান-কাটার ক্লেশ এখনও চেহারার কৈশোরিক লালিত্য ম্লান করতে পারেনি। ওর বয়সী ছেলেরা পাড়ার মোড়ে বসে ফোনে পাবজি-ফ্রি ফায়ার খেলছে দেদার। ওর জায়গা হয়েছে মৌসুমী ধান-কাটা কামলার খাতায়। মৌসুমে রোজানা আয় হাজার টাকার এদিক সেদিক। মন্দ কী!
‘আপনে দাওরা শেষ দিছেন?’ ধান কাটার অগ্রগতি দেখতে ক্ষেতে আসতেই ছেলেটা ধানের আটি বাঁধতে বাঁধতে শুধালো আমায়। প্রথমে আমি বুঝি নাই কথার মর্মার্থ। তাছাড়া ওইটুকুন কামলা-ছেলে আমার দাওরা নিয়ে সুওয়াল করবে কী কারণে?
‘বুঝলাম না…!’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি আমার।
‘মানে আপনে দাওরা দিছেন? শেষ করছেন?’
‘হ্যাঁ, দাওরা তো শেষ দিছি সেই কবে।’
‘তারপর কী করছেন?’
‘তারপর অনার্স মাস্টার্স করছি…।’
‘ও…।’
আমার মনে খটকা লাগে। এই ছেলে মাদরাসার ‘দাওরা’ জমাত নিয়ে সুওয়াল করছে কেন? ধানের গোছায় কাস্তে চালাতে চালাতে ভাবি আমি। ছেলেটার দিকে আরেকবার তাকাই। কী যেন একটা সন্দিহান আছে চেহারার সুরতে।
‘তুমি মাদরাসায় পড়ছো?’
‘জি। পড়তে পারি নাই বেশি।’
‘পড়তে পারো নাই কেন?’
‘ইয়াদ থাকতো না। আমুক্তা শুনাইতে পারতাম না…।’
‘হেফজখানায় পড়ছো?’
‘জি।’
‘কয় পারা হেফজ করছিলা?’
‘চৌদ্দ পারা।’
‘তো তারপর কিতাবখানায় ভর্তি হইতা!’
‘বাড়িতে বলছিলাম, তারা রাজি হয় নাই। আর ওদিকে তো কিতাবখানা মাদরাসা নাই বেশি। আমার পড়ার অনেক ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বাড়ির কাছে মাদরাসা না থাকায় বাড়ির লোকজন পড়তে দেয় নাই।’
‘বাড়ি কই তোমার?’
‘নীলফামারি, ডোমার।’
‘এখন পড়তে চাও?’
‘নাহ, এখন আর ইচ্ছা নাই।’
‘কেন? এখনও তো পড়তে পারো। তোমার বয়সী কত পোলাপান মাদরাসায় ভর্তি হয়। চাইলে বলো, আমি মাদরাসা ঠিক করে দিব।’
পাশে ধান কাটতে থাকা আরেক মাঝবয়সী চাচা কথার নাটাই ধরেন, ‘হ, পড়তে চাইলে কও, হুজুর তোমারে ভর্তি কইরে দেবে।’
ছেলেটার তাতে তেমন আগ্রহ দেখি না। ইতিমধ্যে বাড়িঘর ছেড়ে ইপিজেডে এসে গার্মেন্টসের কাজে ঢুকেছে। মাস শেষে ১০-১২ হাজার কামাই তো নিশ্চিত। আর ধানের মৌসুমে চাকরি ছেড়ে চলে আসে আমাদের ধানী এলাকায়। মাসখানেক ধান কাটলে ২০-২৫ হাজার টাকা পকেটে পুরা যায়। এই বয়সে টাকার মায়া বড় নির্দয়। বড় বেলাহাজ।
‘আমার দুই মাইয়ারে মাদরাসায় দিছি।’ মাঝবয়সী চাচা নিজের জিন্দেগি কা তাজুরবা শেয়ার করেন। ‘আমি চাইছিলাম হাফেজ বানামু। কিন্তু হুজুররা বলল মেয়েদের হাফেজ বানানো উচিত হইবে না। তাই কিতাবখানায় পড়ে।’
‘মাশাল্লাহ। আপনাদের ওদিকে তো মহিলা মাদরাসা আছে অনেক।’
‘মেয়ে সামনে দুই বছর পর মেট্রিক দিবে।’
‘মাদরাসায় না পড়ে বললেন!’
‘স্কুলেও ভর্তি করে দিছি, পরীক্ষা দিবে।’
চালু পাবলিক। ঘটে বুদ্ধি রাখে।
‘এহনই মেয়েদের বিয়ের সম্বন্ধ আসতে শুরু করছে।’
আমি হাসি।
‘আমার দুই ভায়রা তাগো পোলার জন্য প্রস্তাব দিতে শুরু করছে। যে ভায়রারা আমার বিয়ার ১৪-১৫ বছরে একটা সুতা পর্যন্ত দেয় নাই, এই ঈদে এক ভায়রা আমার জন্য লুঙ্গি-গেঞ্জি পাঠাইছে।’
‘হাহাহা…তাই নাকি? ভায়রার ছেলেরা করে কী?’
‘একজন গার্মেন্টসে কাম করে, আরেকজন ঢাকায় কন্সট্রাকশনের কাম করে নাকি।’
‘শোনেন, মেয়েরে পড়াইতেছেন মাদরাসায়, সে আলেমা হবে। তার বিয়া একটা হুজুর দেইখা দেওয়া উচিত না? তাইলে না দুইজনের মনের মিল হবে। দুইজনে দুইজনকে বুঝবে। হুজুরের ট্যাকা পয়সা কম থাকতে পারে, কিন্তু একটা মিলের ব্যাপার আছে না?’
‘আমারও তো এই কথা। কিন্তু আমার বউ আবার তার বইনের ছেলেগো নিয়া ষোলআনা রাজি। সারাদিন ফোনে গুটুরগুটুর করতে থাকে দুই বইনে।’
‘না, এই কাম কইরেন না। পরে দেখবেন এক আত্মীয় করতে গিয়া দুই আত্মীয় হারাইবেন…।’
ধান কাটতে কাটতে আমাদের গুফতেগু চলতে থাকে। এক পোঁচে পাকা ধানের একেক গোছা কেটে হাতের তালুতে জমা করতে হয়। পাঁচ-সাত গোছা ধানে একটা হৃষ্টপুষ্ট আটি বাঁধা নিয়ম। আটির পর আটি ক্ষেতের মধ্যে কাতারবন্দী হয়ে শুকাতে থাকে দুপুরের রোদে। রোদে তেতে উঠে আমার পিঠের শিক্ষিত চামড়া। গামছা-বাঁধা জ্ঞানী মাথা ঘামতে থাকে তির তির করে। আমি ঘণ্টাখানেক পর বিদ্যাপুস্তকের রাশি রাশি জ্ঞান কাঁধে করে ক্ষেত থেকে বাড়ির পথ ধরি। ১৪ পারার হাফেজ আর মাদরাসাপড়ুয়া দুই কন্যার দায়গ্রস্ত পিতা কাটতে থাকেন গোছার পর গোছা ধান। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ…!


Leave a Reply

Your email address will not be published.