রাজপথে ছাত্রদের ‘ট্রাফিকিং’-এর অনুপস্থিতিতে গত দুই-তিন দিন ধরে ধানমণ্ডি-মোহাম্মদপুরে ব্যাপক যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এমনকি সকাল সাড়ে সাতটা-আটটার সময়ও। স্টুডেন্ট ট্রাফিক কন্ট্রোলিংয়ের সময় যানজটটা এমন তীব্র হতো না। আর যানজট কেন লাগছে, সেটা গাড়ি থেকে রাস্তায় তাকালে খালি চোখেই দেখা যায়। লেন না মেনে গাড়ি চালানো, রাস্তার দুই পাশে যত্রতত্র গাড়ি-রিকশা-ঠেলাগাড়ি পার্কিং, সিগন্যাল মানতে অনীহা ইত্যাদি আরও নানা কারণ অকারণ। ছাত্রদের বিগত সপ্তাহখানেক ট্রাফিক কন্ট্রোলিংয়ের সময় এই অনিয়মগুলো ছিল না। ফলে যানজটের ভোগান্তিও অনেক কমে এসেছিল।
এখন কথা হলো, ছাত্ররা তো সারা বছর ট্রাফিক কন্ট্রোল করবে না। তাহলে এই যানজট কি আজীবনেও শেষ হবে না? এর উত্তরটা ছাত্ররাই দেখিয়ে দিয়ে গেছে। তারা দেখিয়েছে, সড়কে যদি শৃংখলা আনয়ন করা যায় তাহলে যানজট বহুলাংশে কমানো সম্ভব। ট্রাফিক পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মিলনে এই ‘শৃংখলা আনয়ন’ খুব সহজ ব্যাপার। এটা এমন কোনো কঠিন কাজ না। পুলিশের সদিচ্ছা থাকলে ঢাকার যানজট তুড়ি মেরে কমিয়ে ফেলা যায়। ছাত্ররা সেটা বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, পুলিশ সেটা করতে পারবে না। কারণ, আমাদের রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর সিস্টেমেটিক ফেইলিয়র। আমাদের এই রাষ্ট্রের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা, প্রশাসন, দপ্তর, অধিদপ্তর বিগত ১৫-২০ বছরে এমন সিস্টেমেটিক অনিয়ম, দুর্নীতি, অবহেলা, স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে কলুষিত হয়েছে যে, এখন কোনো সৎ অফিসার চাইলেও হুট করে এই সিস্টেম ভেঙে ‘সিংহাম’-এর মতো সুবিচার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। হোক সেটা রাষ্ট্রের উপদেষ্টা কিংবা কোনো আমলা। জগদ্দল পাথরের মতো জেঁকে বসা এই সিস্টেম দুদিনে ভাঙা সম্ভব নয়।
দুই
এখন এই সিস্টেম আপনি বদলাবেন কীভাবে? আর সিস্টেম যদি না বদলান তাহলে এই বিপ্লব, এই এত এত তরুণ প্রাণের আত্মদান, কোটি কিশোর-তরুণের চোখে-মুখে স্বপ্নের বীজ রোপন, মানুষকে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নেয়ার অভয়; সবই কি তাহলে বৃথা যাবে না?
আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক কাঠামো বা সিস্টেম যদি না বদলান তাহলে কী হবে? ধরে নিলাম সামনে আবার একটি স্বাধীন সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা আবার সেই পুরোনো সিস্টেমেই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। করতে বাধ্য। কেননা নির্বাচনে তো সরকার পরিবর্তন হয়েছে শুধু, গুটিকয়েক মানুষ ৩০০ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে সাংসদ হয়েছেন মাত্র, দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রীয় সিস্টেম তো পরিবর্তন হয়নি।
নতুন সরকার তার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মানসে সচিবালয়ের সচিব থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের পিয়ন পর্যন্ত দলীয়করণ করা হবে। জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে ব্যাংকের এলসি, সবখানে ঘুষই দিতে হবে। সুইপারের চাকরি থেকে শুরু করে বিসিএস ক্যাডার, সকল সরকারি চাকরির জন্য টাকা দিতেই হবে। আবার ব্যাংক লুট হবে, আবার হাওয়া ভবন, বেগমপাড়া, আয়নাঘর তৈরি হবে। আবার পুলিশ-র্যাব-গোয়েন্দারা সরকারের ভাড়াটে খুনী হয়ে জুলুমের নয়া নয়া দাস্তান তৈরি করবে।
কারণ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার সিস্টেমটাই এমন। এখানে আপনি পাইপের এক মাথা থেকে এক টুকরো স্বর্ণ ঢুকিয়ে দেবেন, সেটা পাইপের আরেক মাথা দিয়ে যখন বের হবে তখন দেখবেন সেটা সুন্দর এক দলা হলুদ বর্ণের ‘বিষ্ঠা’য় রূপান্তরিত হয়েছে। আপনাকে এই পুরো পাইপলাইন পরিবর্তন করতে হবে।
তিন
নির্বাচন নির্বাচন বলে আমরা অনেকেই জিগির তুলছি। দ্রুত সময়ে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আসমানী দাবি-দাওয়া তুলছি। তাকে কী হবে? কিসের পরিবর্তন হবে? মূলত কিছুই হবে না। সব আবার সেই সিস্টেমেটিক দুঃশাসনেই পতিত হবে।
সুতরাং সর্বোতভাবে এই রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন নামের প্রহসন নাটক মঞ্চস্থ না হওয়াটাই বাঞ্চনীয়। উত্তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে ডিগবাজি দেওয়ার জন্য তো বিপ্লব হয়নি। বিপ্লব হয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অপশাসনে জর্জরিত রাষ্ট্রীয় সিস্টেমকে রিফর্ম করার স্লোগান বুকে ধরে। সেটা যদি করা সম্ভব না হয়, অথবা সেটা করতে যদি শরম লাগে বা দ্বিধা হয়, তাহলে প্রত্যেকজন শহীদের কবরের পায়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চান এবং প্রত্যেক সেই তরুণ-তরুণীর পায়ে ধরে ক্ষমা চান, যারা রাজপথে নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে হাসিনার খুনী বাহিনীর বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল।
যে ছাত্র-জনতার হাত ধরে বিপ্লব সাধিত করতে পারলাম, তাদের হাত ধরে সিস্টেম বদলাতে আমাদের ভয় কেন? যাদের হাতে সমগ্র দেশের ভার তুলে দিতে পারলাম, তাদের হাতে সংবিধান তুলে দিতে ভয় কিসের? ‘সংবিধানহীনতা’র চেয়ে সংশোধিত সংবিধানে সমস্যা কোথায়?
চার
ছাত্রদের ঘুমালে চলবে না। কাজ শেষ হয়েছে বলে পেশীতে ঢিল দিলে চলবে না। তোমাদের কাজ শেষ হয়নি। তোমাদের কাজ শুরু হলো কেবল। এই বিপ্লব ছিল ওয়ার্মআপ ম্যাচ। এবার আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচ খেলতে প্রস্তুত হও।
মনে রাখবা, তোমার কোনো দল নাই। সমন্বয়কের সার্টিফিকেটের জরুরত নাই তোমার। রাস্তায় যানজট দেখলে চৌরাস্তায় দাঁড়ায়া যাইবা পতাকা হাতে নিয়া। ঘুষ দিতে বা নিতে দেখলে জনতাকে সঙ্গে নিয়া তাদের আইনের হাতে তুইলা দাও। কোনো দল বা ব্যক্তিরে চাঁদাবাজী করতে দেখলে রুখে দাঁড়াও। কোথাও কোনো সরকারী দপ্তরে অন্যায্য টাকা চাইলে তাদের ধরায়া দাও, তাদের ভিডিও কইরা মুখোশ উন্মোচন করো। কোথাও অসহায় মানুষ দেখলে তাদের সাহায্যের জন্য আগায়া যাও। সকল দুর্যোগে সংঘবদ্ধ হও। তোমার কোনো দল নাই। তোমার ছাত্রত্ব তোমার সার্টিফিকেট। তোমার তারুণ্য তোমার সংবিধান।