দুই বছর আগে আমি ও আমার বউ যখন উমরা থেকে ফিরে এলাম, বউয়ের এক হিন্দু বান্ধবী এলো দেখা করতে। শ্বশুরবাড়ির কাছেই বাড়ি। সে এসেছে এক আর্জি নিয়ে। আর্জি কী? তাকে জমজমের পানি দিতে হবে। তার মেয়ে প্রথমবারের মতো সন্তানসম্ভবা। শুনেছে জমজমের পানিতে আশীর্বাদ আছে। এই পানি খেলে তার মেয়ের গর্ভকালীন সমস্যা দূর হয়ে যাবে!
তারও বছর দেড়েক আগে যখন তার মেয়ের বিয়ে হয়, আমার শশুরবাড়ির সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিল বিয়েতে। কিন্তু আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ধার্মিক বিধায় সে জানতো, তারা তাদের বাড়িতে এসে খাওয়া দাওয়া করবে না। তাই সে মুসলমানদের জন্য আলাদাভাবে রান্না করা খাবার আমার শ্বশুরবাড়িতে এসে দিয়ে গেছে।
দুই
বাংলাদেশে যখনই আমি সংখ্যালঘু, বিশেষভাবে বললে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের সংবাদ শুনি, তখনই আমি ভাবি, এই নির্যাতনগুলো কোথায় হয়? কেন হয়? আমি আমার স্বচক্ষে কোনোদিন তো এইসব দেখলাম না।
আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামগুলোতে অনেক হিন্দু পরিবারের বসবাস। পাশের একটা গ্রাম না, অনেকগুলো গ্রামেই হিন্দুদের বসবাস। আমাদের গ্রামে হিন্দু বসতি না থাকলেও চারপাশের গ্রামগুলোতে হিন্দুরা আদিকাল থেকেই বসবাস করে আসছে। আমাদের ক্ষেতের সঙ্গে তাদের ক্ষেত, আমাদের আইলের সঙ্গে তাদের আইল। সেই দাদার সময় থেকে দেখে আসছি, তারা ক্ষেত দেখতে এলে আমাদের বাড়িতে এসে দাদার সঙ্গে বসে হুক্কা-বিড়ি খেয়ে যেত। তাদের কখনো ‘সংখ্যালঘু’ মনে হয়নি। শুধু এতটুকুই তফাত, আমরা মুসলমান ওরা হিন্দু। আমাদের ধর্ম আলাদা, ওদের ধর্ম আলাদা। মাঝখান দিয়ে এই ‘সংখ্যালঘু’ তকমাটা কোথা থেকে জানি হাজির হলো।
আমি জীবনে একবারের জন্যও কখনো শুনিনি যে এসব গ্রামের হিন্দুদের ওপর ‘সংখ্যালঘু’ তকমা দিয়ে কখনো নির্যাতন করা হয়েছে বা তাদের মন্দির-প্রতিমা ভাঙা হয়েছে। ফলে আমার মনে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক: বাংলাদেশের কোথায় তাহলে হিন্দু নির্যাতন হয়?
আমাদের বাজারের অধিকাংশ দোকান হিন্দুদের। আমি মুদির জিনিসপাতি সবসময় অজিত-সুজিত আংকেলের দোকান থেকে কিনি। চুল কাটাই মনোরঞ্জন বা রিপন সাহার সেলুনে। ফল কিনি যার থেকে, তিনিও হিন্দু। ওষুধ কিনি হরিপদ আংকেলের ফার্মেসি থেকে। হরিপদ আংকেল আমাদের পারিবারিক ডাক্তারের মতো। বিস্কুট, চানাচুর বা বাচ্চাদের দুধ কিনি গোপালদার দোকান থেকে। গোপালদা স্কুলে আমার ছোট বোনের সহপাঠী ছিল। আমার স্কুলের সহপাঠী বিকাশ চন্দ্রের দোকান থেকে কিনি প্লাস্টিকের তৈজসপত্র। আর মাছের কথাই বা বাদ যাবে কেন? জেলে প্রেম সাহা প্রতি হাটে আমাকে দেখলেই বড় পাঙ্গাস গছিয়ে দেবার তক্কে থাকে।
এই লেখা লিখতে গিয়ে এখন আমার মনে হচ্ছে, বাজারে গেলে কতভাবে হিন্দুদের সঙ্গে মিশি, মিশতে হয়। কিন্তু এতদিন আমার মনে কখনো উদয়ই হয়নি যে ওরা ‘সংখ্যালঘু’ হিন্দু, ওরা ভিন্ন ‘সংখ্যালঘু’ ধর্মাবলম্বী, ওদের প্রতি নির্যাতন করা হয়। আমার মনে হয়েছে ওরা আমার প্রতিবেশী, আমার পরিচিত, ওরা দোকানী, ওরা ভিন্ন কেউ নয়, ওরা ‘সংখ্যালঘু’ নামের আড়ালে কোনোভাবেই করুণাপ্রত্যাশী নয়।
তাহলে আমাকে কেন বার বার বলা হচ্ছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা? কেন এমন সংবাদ আমাকে দেখানো হচ্ছে যেখানে ইনিয়ে বিনিয়ে সংখ্যালঘুতত্ত্বকে জায়েজ করা হচ্ছে? কেন ভারতের শত শত মিডিয়া ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ভুল সংবাদ দেখিয়ে উস্কে দিচ্ছে এ দেশের মানুষকে? আর কেনই বা বাংলাদেশের এক শ্রেণির হিন্দু ফটকাবাজ বার বার শুধু নিজেদের অনিরাপদ মনে করেন? কেন তারা ভারতের দিকে চেয়ে ধর্না দিয়ে বসে থাকেন? কেন তারা আওয়ামী লীগের কোলে উঠে জুলুমকে বলতে চেষ্টা করেন সুশাসন? শেখ হাসিনার স্বৈরাচারিত্ব কেন একবারও চোখে দেখেন না? কেন তাদের সংখ্যালঘুতত্ত্বে দুর্নীতিকে অপশাসন বলার সাহস দেয় না? নিজেদের সংখ্যালঘুত্ব বজায় রেখে কেন তারা করুণা ভিক্ষা করার মতো অপমানজনক প্রচেষ্টায় লিপ্ত হন? কেন?
আমরা তাদের বলছি তোমরা বাংলাদেশী। কিন্তু তারা জোর করেই আদায় করে ছাড়ছে, না আমরা সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু হতে এত মজা লাগে কেন? এত কিসের ফায়দা সংখ্যালঘু হওয়ার মধ্যে? আমার হরিপদ বা সুজিত আংকেলের মুখে আমি জীবনে সংখ্যালঘু শব্দ শুনি নাই। প্রেম কিংবা মনোরঞ্জন সাহাকে কোনোদন অনিরাপদ ভাবতে দেখি নাই। হিন্দু বলে তাদের কখনো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভাবতেও দেখি নাই।
তাহলে এই ‘অনিরাপদবোধ’ করা হিন্দু কারা? এরা কাদের কথায় দুদিন পর পর অনিরাপদবোধ করে? এই ‘কতিপয়’ অনিরাপদবোধকারী হিন্দুকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।


Leave a Reply

Your email address will not be published.