বঙ্গদেশে ইসলামের আগমন এবং ইসলাম প্রসারে পশ্চিমাঞ্চলীয় (আরব, পারস্য, মধ্যএশিয়া) সুফি আলেম বা বঙ্গীয় সুফি দরবেশদের নাম যেভাবে বিবৃত হয়ে আসছে, সে অনুপাতে ইসলামি শিক্ষায়তন, শিক্ষা-ব্যক্তিত্ব, ইসলামি শিক্ষা প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিদের বর্ণনা খুব একটা নেই। বিশেষত ত্রয়োদশ শতকের গোড়ায় ইখতিয়ারুদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে বখতিয়ার খিলজী বাংলাদেশে আগমনের পর থেকে নিয়ে ইংরেজ পরবর্তী সময় পর্যন্ত ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রের খুব বেশি উপাত্ত আমাদের ইতিহাসে বর্ণিত হয়নি।

কিন্তু আবির্ভাবের পর থেকেই ইসলামের বৈশিষ্ট্য হলো, ইসলাম ও মুসলিমরা যেখানে গিয়েছে সেখানেই ব্যাপকভাবে ইসলামি শিক্ষায়তন ও জ্ঞানচর্চাকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। ইসলাম আরব থেকে পারস্য, রোম ও আফ্রিকায় ছড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে এর একটি স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল―প্রতিটি বিজিত জনপদে অধিক হারে জ্ঞানকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। আরব থেকে নিয়ে সুদূর স্পেন পর্যন্ত এর প্রভাব লক্ষণীয়।

সে দৃষ্টিতে দেখলে বাঙলা অঞ্চলকে খানিকটা অপাংক্তেয় মনে হয়। এ দেশে শত শত সুফি আলেম ও দরবেশ এসেছেন, ইতিহাসে তাদের উল্লেখ একেবারে অপ্রতুল নয়। তবে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষা-ব্যক্তিত্বের সন্ধান আমাদের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। রাজা-বাদশাহ আর জয়-পরাজয়ের প্রতিচ্ছবি আঁকতে গিয়ে হয়তো ইতিহাস থেকে তারা বিস্মৃত হয়ে গেছেন; কিংবা বঙ্গদেশে সুফি ও দরবেশদের অতিলৌকিক প্রাচুর্য বয়ান করতে গিয়ে আড়ালে রয়ে গেছেন অনেক এমন মনীষা―ইতিহাস যাদের স্মরণে খুব একটা সুবিচার করেনি। এমনই এক বিস্মৃত মনীষা শায়খ আখি সিরাজউদ্দিন উসমান রহমাতুল্লাহি আলায়হি।

 

পরিচয়ের সন্ধান

শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমান তৎকালীন বাঙলার রাজধানী লাখনৌতির (লক্ষ্মণাবতী) অধিবাসী ছিলেন, যা বিভিন্ন সময়কালে গৌড় ও পাণ্ডুয়া নামে অভিহিত হতো। শায়খ সিরাজুদ্দিন উসমানকে অনেক গ্রন্থকার বাদায়ুনের অধিবাসী বলে মনে করেছেন। এ মত অবলম্বন করার ব্যাপারে মির্জা মুহাম্মদ আখতার দেহলবির তাজকিরায়ে আউলিয়ায়ে হিন্দ গ্রন্থটি প্রধানতম ভূমিকা পালন করেছে। রফিকুল আরেফিনের সংগ্রাহকের মতে সিরাজুদ্দিন উসমান ছিলেন অযোধ্যার অধিবাসী। কিন্তু অন্যান্য অধিকতর প্রামাণ্য গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সিরাজুদ্দিন উসমান বাঙলার অধিবাসী ছিলেন। সিয়ারুল আউলিয়া গ্রন্থে বলা হয়েছে, সিরাজুদ্দিন উসমান ছিলেন পাণ্ডুয়ার অধিবাসী। আখবারুল আখইয়ার গ্রন্থে বলা হয়েছে, সিরাজুদ্দিন উসমান তার পীর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার কাছ থেকে খেলাফত লাভ করার পর লাখনৌতি অর্থাৎ গৌড়ে ফিরে যান। খাজিনাতুল আসাফিয়ার লেখক গোলাম সারওয়ারও তাকে বাঙলার অধিবাসী বলে মত প্রকাশ করেছেন।

সাইয়েদ মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানি রচিত সিয়ারুল আউলিয়া গ্রন্থটি ভারতীয় উপমহাদেশের আলেম, সুফি ও ইসলামি ব্যক্তিত্বের জীবনীনির্ভর সবচে পুরোনো গ্রন্থ। এ গ্রন্থটিকে এ অঞ্চলে জীবনীনির্ভর প্রথম গ্রন্থও বলা যায়। এর আগে ১৩০৭ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৭০৭ হিজরিতে আমির হোসাইন সানজারি কর্তৃক ফাওয়ায়িদুল ফাওয়াদ নামে আরেকটি জীবনীগ্রন্থ রচিত হয়, যেটি তৎকালীন দিল্লির বিখ্যাত সুফি দরবেশ খাজা নিজামুদ্দিন চিশতি রহ.-এর (জন্ম ১২৩৬―মৃত্যু ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ) জীবনীভিত্তিক প্রামাণ্যগ্রন্থ। এটি নিজামুদ্দিন চিশতির জীবদ্দশায় রচনা করা হয়।  ভারতবর্ষে মুসলিম ব্যক্তিত্বের জীবনীনির্ভর এটি প্রথম জীবনীগ্রন্থ হিসেবে ধরা হয়।

ফাওয়ায়িদুল ফাওয়াদ রচয়িতা আমির হোসাইন সানজারি যেমন নিজামুদ্দিন চিশতির একান্ত শিষ্য ছিলেন তেমনি সিয়ারুল আউলিয়া রচয়িতা সাইয়েদ মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানিও তাঁর শিষ্য ছিলেন। মুহাম্মদ কিরমানি রচিত গ্রন্থের বিশেষত্ব হলো, তিনি তাঁর সময়কাল এবং পূর্ববর্তী প্রায় শতাধিক ভারতীয় আলেম ও সুফির জীবনী এখানে সন্নিবেশ করেছেন। বিশেষ করে, নিজামুদ্দিন চিশতির অধিকাংশ খলিফার জীবনী এ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। যেহেতু মুহাম্মদ কিরমানি সিরাজুদ্দিন উসমানের সমসাময়িক ছিলেন এবং দুজনই নিজামুদ্দিনের শিষ্যত্ব লাভে ধন্য হয়েছিলেন, সুতরাং কিরমানির বক্তব্য অধিকতর সঠিক বিবেচিত।

২০১৮ সালে ভারতের আহমেদাবাদের মাদরাসায়ে আরাবিয়া আহলে সুন্নাতের শায়খুল হাদিস মুফতি আবদুল খবির আশরাফি মিসবাহি একটি স্বতন্ত্র গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেন শায়খ সিরাজুদ্দিন উসমানের জীবন ও কর্মের ওপর। আয়েনায়ে হিন্দ শায়খ আখি সিরাজউদ্দিন উসমান : আহওয়াল ও আসার শিরোনামের গ্রন্থটি সিরাজুদ্দিন উসমানের জীবন ও কর্মের ওপর বিশদ গবেষণালব্ধ একটি গ্রন্থ। এ গ্রন্থে লেখক জামিয়া মিল্লিয়ার গবেষক গোলাম রসুল দেহলবির গবেষণা প্রবন্ধ Chishti-Nizami Sufi Order of Bengal-এর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, Shaikh Akhi Siraj, a native of Bengal, is now deemed by some modern scholars as a native of Badaun. But some contemporary evidences prove beyond doubt that the saint belonged to Bengal.

তবে মুফতি আবদুল খবির মিরআতুল আসরার গ্রন্থের বরাত দিয়ে লিখেছেন, সিরাজুদ্দিন উসমানের পিতা ও পিতামহ ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের অযোধ্যা থেকে হিজরত করে বাঙলায় আসেন। এখানেই পরবর্তীতে সিরাজুদ্দিন উসমানের জন্ম হয়; অথবা এমনও হতে পারে, সিরাজুদ্দিনের বাল্যকালে পিতা ও পিতামহ হিজরত করে বাঙলায় আসেন। সিরাজুদ্দিন উসমানের পিতা ও পিতামহ কেন অযোধ্যা থেকে বাঙলায় আসেন, এর সঠিক কোনো কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে সে সময়কার দিল্লি ও বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে নজর দিলে বুঝে আসবে, তখনকার ভারতীয় মুসলিমদের একস্থান হতে অন্য স্থানে হিজরত খুব একটা অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না। রাজনৈতিক নানা পটপরিবর্তনের দরুণ এক রাজ্যের মুসলিমগণ ভাগ্যান্বেষণে আরেক রাজ্যে পাড়ি জমাতেন। হয়তো সিরাজুদ্দিন উসমানের পরিবারও ভাগ্যান্বেষণে অযোধ্যা থেকে বাঙলায় আসেন। কারণ বাঙলা তখন ধন-ঐশ্বর্যে ভারতবর্ষের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল বিবেচিত হতো।

শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমানের ব্যক্তিপরিচয়ের ব্যাপারে আমরা আরও কিছু তথ্য পাবো Proceedings of the Indian History Congress -এর প্রকাশিত জার্নালে। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত জার্নালের ৫৬তম সংখ্যায় মুহাম্মদ কামারুদ্দিন Shaikh Alauddin Pandavi—A sufi saint of Pandua in fourteenth century শিরোনামে লিখেছেন Hazrat Shaikh Alauddin bin Shaikh Asad Lahori was a disciple of and spiritual successor to Hazrat Shaikh Sirajuddin Usman, better known as Hazrat Akhi Siraj and Aina-i-Hind (or Mirror of India). He was born in 701/1301 in a rich family. His father, uncles, brothers and cousins held high ranks at the court of the Sultan of Bengal. In fact his father was the Finance Minister at the Sultan’s court.

‘শায়খ আলাউদ্দিন (আলাউল হক নামে প্রসিদ্ধ) ইবনে শায়খ আসাদ লাহোরি ছিলেন শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমানের শিষ্য এবং আধ্যাত্মিক মুরিদ। তিনি আখি সিরাজ এবং আয়নায়ে হিন্দ (ভারতবর্ষের দর্পণ) নামে অধিক পরিচিত। তিনি (আলাউল হক) ৭০১ হিজরি মোতাবেক ১৩০১ খ্রিষ্টাব্দে এক সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা, পিতৃব্য, ভাই এবং আত্মীয়রা তদানীন্তন সুলতানের (সুলতান আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ, শাসন ১৩০১-১৩২২) দরবারে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। এমনকি তার পিতা সুলতানের দরবারে অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।’

 

জ্ঞানার্জনের জন্য দিল্লি গমন

মুফতি আবদুল খবির সিয়ারুল আউলিয়া গ্রন্থের সূত্রে উল্লেখ করেছেন, সিরাজুদ্দিন উসমান আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জনের জন্য যখন দিল্লিতে নিজামুদ্দিন চিশতির দরবারে আসেন তখন তার বয়স ১৪ বছর বা কিছু কমবেশি ছিল। এ-ও বলা হয়েছে, তখন তার মুখে দাড়ি-গোঁফ গজায়নি।

খাজা নিজামুদ্দিন চিশতির দরবারে তিনি বেশ কিছুদিন আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জনে ব্যাপ্ত থাকেন। দিল্লিতে চিশতিয়া খানকায় অবস্থানকালীন আধ্যাত্ম কঠোর অধ্যাবসায় ও মুজাহাদা চালিয়ে যান। এখানে একটি প্রশ্ন উঠে আসা স্বাভাবিক। সিরাজুদ্দিন উসমান এত অল্প বয়সে কেন আধ্যাত্মিক দীক্ষার জন্য চিশতিয়া খানকায় গেলেন? আমরা যদ্দুর বুঝতে পারি, আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য একজন শিষ্যের ন্যূনতম তরুণ হওয়া প্রয়োজন এবং তাকে ধর্মীয় প্রাথমিক জ্ঞানে পারদর্শী হতে হয়। কিন্তু মাত্র ১৪ বছর বয়সে আধ্যাত্মিক শিক্ষার জন্য কেন তিনি খাজা নিজামুদ্দিনের দরবারে হাজির হলেন, এমন প্রশ্ন অবান্তর নয়।

হতে পারে তার পিতা বা পিতামহ খাজা নিজামুদ্দিনের একান্ত অনুরক্ত ছিলেন বিধায় কৈশোরেই তাকে দিল্লি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অথবা তিনি হয়তো দিল্লিতে আগমনের পূর্বে ইসলামের প্রাথমিক জ্ঞানার্জন রপ্ত করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। সিয়ারুল আউলিয়াসহ অন্যান্য ইতিহাসগ্রন্থ সিরাজুদ্দিন উসমানের জ্ঞানার্জনের ব্যাপারে চমৎকার একটি ঘটনা উল্লেখ করেছে।

সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে যেসব শিষ্য নিজামুদ্দিন চিশতির দরবারে জ্ঞানার্জন ও আধ্যাত্মিক সান্নিধ্যলাভের জন্য আসতেন, তিনি জ্ঞানগত গভীরতা উপলব্ধি করে তাদেরকে খেলাফত প্রদান করে ইসলামি দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দিতেন। সিরাজুদ্দিন উসমান কিছুদিন খাজা নিজামুদ্দিনের খানকায় অতিবাহিত করার পর তাকেও খেলাফত প্রদানের লক্ষ্যে সুলতানুল মাশায়েখ খাজা নিজামুদ্দিনের সামনে উপস্থিত করা হয়।

‘কিছুদিন’ বলতে আসলে সিরাজদ্দুন ঠিক কতদিন সেখানে অবস্থান করেন, তার বয়স কেমন হয়েছিল এবং কী পরিমাণ আধ্যাত্মিক জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন, সে ব্যাপারে আমরা কিছু জানতে পারি না। হতে পারে এক বছর বা দুই বছর, অথবা তার চেয়েও অধিক সময় তিনি দিল্লিতে মুর্শিদের দরবারে আধ্যাত্মিক সাধনায় ব্যাপৃত ছিলেন। মুফতি আবদুল খবির লাতায়েফে আশরাফি গ্রন্থের সূত্র উল্লেখ করে লিখেছেন, সিরাজুদ্দিন উসমান আধ্যাত্ম সাধনার অধিকাংশ সময় মুর্শিদ খাজা নিজামুদ্দিনের সান্নিধ্যে কাটাতেন এবং কাগজ ও কিতাব ছাড়া তার কাছে আর কোনো জরুরি আসবাবপত্র ছিল না।  এ থেকে বুঝা যায় জ্ঞান ও আধ্যাত্ম সাধনায় সিরাজুদ্দিন উসমানের প্রচেষ্টা কেমন নিবেদিত ছিল। তার পরিবার লাখনৌতির প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিতান্ত সাদাসিধেভাবে তার দীক্ষাকাল অতিবাহিত করেন। আধ্যাত্মিক দীক্ষার জন্য নিজের ‘আমিত্ব’কে লীন করে দেয়ার যে আবশ্যিক অনুষঙ্গ, তিনি সেটা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন।

আধ্যাত্ম সাধনায় ব্রতী হওয়ার কিছুদিন পর যখন অন্য শিষ্যদের সঙ্গে তার নামও খেলাফত প্রদানের লক্ষ্যে তালিকাভুক্ত করে খাজা নিজামুদ্দিনের সামনে পেশ করা হয় তখন খাজা তালিকা থেকে তার নাম বাদ দিয়ে দেন। তিনি সিরাজুদ্দিনের সার্বিক ‘হালত’ পর্যালোচনা করে মন্তব্য করেন, ‘খেলাফত গ্রহণের জন্য সর্বপ্রথম ইলমের পরিপূর্ণতা আবশ্যক। সিরাজুদ্দিন উসমান এখনও সে পরিমাণ প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করতে পারেনি।’

মুফতি আবদুল খবির তার গ্রন্থে সাইয়েদ মুহাম্মদ আশরাফির বরাত দিয়ে লিখেছেন, আধ্যাত্মিক দীক্ষায় শায়খ সিরাজুদ্দিন উসমানের ‘ইলমে লাদুন্নি’ অর্জিত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তিনি তখনও কোনো শিক্ষকের সামনে বসে কিতাবি বিদ্যা অর্জন করেননি।’

তারিখে দাওয়াত ও আজিমাত গ্রন্থে সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি রহ. বিষয়টি আরেকটু বিশদভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেন, ‘বাঙলার যোগ্যতাসম্পন্ন এক তরুণ যিনি পরবর্তীতে আখি সিরাজ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন এবং পাণ্ডুয়ায় চিশতিয়া খানকার বিখ্যাত আলেম হিসেবে বরিত হন, তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে লাখনৌতি থেকে দিল্লি আসেন। তিনি সেখানে খাজা নিজামুদ্দিনের শিষ্যত্ব লাভ করেন। পরবর্তীতে খাজা নিজে মাওলানা ফখরুদ্দিন জাররাদিকে বলেন, এই তরুণ অনেক গুণসম্পন্ন। ধর্মীয় জ্ঞানে তার দখল থাকলে সে জগদ্বিখ্যাত দরবেশ হতে পারবে। মাওলানা ফখরুদ্দিন বলেন, আপনি যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি আমার সান্নিধ্যে রেখে তাকে প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞানের শিক্ষা দিতে চাই। খাজা বলেন, সে আপনার সান্নিধ্যের যোগ্য বটে।’১০

জ্ঞানসাধক শায়খ ফখরুদ্দিন জাররাদি পরবর্তীতে সিরাজুদ্দিন উসমানের ধর্মীয় বিদ্যা শিক্ষার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন এবং তিনি তার মুর্শিদের সামনে গর্ব করে বলেন, আমি ছয় মাসে সিরাজুদ্দিনকে প্রয়োজনীয় সকল ধর্মীয় জ্ঞানে বিদ্বান করে তুলব।

সিয়ারুল আউলিয়া গ্রন্থকার মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানিও এ সময় ফখরুদ্দিন জাররাদির কাছে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন। মুহাম্মদ কিরমানি তার গ্রন্থে লিখেন, ফখরুদ্দিন জাররাদি সিরাজুদ্দিন উসমানকে আরবিভাষার প্রাথমিক ব্যাকরণ এবং সরফ ও কাওয়ায়েদের বিভিন্ন গ্রন্থ পড়াতে শুরু করেন। শুধু তাই নয়, তিনি সিরাজুদ্দিনের মেধার তীক্ষ্মতা লক্ষ্য করে তার সহজপাঠের জন্য আরবি ব্যাকরণের একটি নতুন পুস্তক রচনা করেন। যেটির নামকরণ করেন সিরাজুদ্দিন উসমানের নামে―তাসরিফে উসমানি অথবা শুধু উসমানি। অল্প দিনে আরবিভাষার প্রাথমিক জ্ঞান রপ্ত হলে শিক্ষক ফখরুদ্দিন জাররাদি সিরাজুদ্দিনকে আরেক বিখ্যাত আলেম মাওলানা রুকনুদ্দিন আন্দরপোতির হাতে সঁপে দেন। তিনি রুকনুদ্দিন আন্দরপোতির কাছে কাফিয়া, মুফাসসাল, কুদুরি, মাজমাউল বাহরাইন এবং মাধ্যমিক স্তরের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কিতাবাদি পাঠ করেন।১১

যোগ্য শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সিরাজুদ্দিন উসমান সত্যি সত্যি মাত্র ছয় মাসে আরবি ভাষাজ্ঞান এবং ধর্মীয় জ্ঞানে মাধ্যমিক স্তরের কিতাবাদি অধ্যয়ন করে সমাপ্ত করেন। তার এমন তীক্ষ্ম ধীশক্তি দেখে অন্য সহপাঠী এবং শিক্ষকগণও আশ্চর্য হয়ে যান। ছয় মাস পর যখন তাকে খাজা নিজামুদ্দিন চিশতির সামনে উপস্থিত করা হয় তখন খাজা সাহেব তাকে তার পঠিত কিতাবাদি থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন করলে তিনি সঠিক উত্তর দিয়ে তাকে পূর্ণ সন্তুষ্ট করতে পারেন।১২  নিজামুদ্দিন চিশতি এরপর আখি সিরাজুদ্দিন উসমানকে খেলাফত প্রদান করেন এবং তাকে ‘আয়নায়ে হিন্দুস্তান’ (ভারতবর্ষের দর্পণ) উপাধিতে ভূষিত করেন। খেলাফত প্রদানের পর তাকে সম্মানসূচক ‘খেলাত’ (উত্তরীয় বা পাগড়ি) প্রদান করা হয়। তিনি অত্যন্ত সম্মানের সাথে এই খেলাত সবসময় তার সঙ্গে রাখতেন।

সিরাজুদ্দিন উসমানের নামের শুরুতে ‘আখি’ কেন ব্যবহার করা হয়, এ ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা কোথাও পাওয়া যায় না। আমার ধারণা, এ আখি শব্দটি মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানি তার রচিত সিয়ারুল আউলিয়া গ্রন্থে প্রথম ব্যবহার করেন। আখি আরবি শব্দ, যার অর্থ ‘আমার ভাই’ বা ‘আমার সাথী’। মুহাম্মদ কিরমানি যেহেতু সিরাজুদ্দিন উসমানের সহপাঠী ছিলেন এবং হয়তো দুজনের মধ্যে গাঢ় বন্ধুত্ব ছিল অথবা তখন ইসলামি বিদ্যায়তনে সহপাঠীকে আখি বলে সম্বোধনের রেওয়াজ ছিল, এ কারণে অন্যান্য জীবনীগ্রন্থেও তাকে আখি বলে সম্বোধন করেছেন। সিয়ারুল আউলিয়া যেহেতু সিরাজুদ্দিন উসমানের জীবনী উল্লেখিত প্রথম গ্রন্থ এবং তার নামের শুরুতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, এ কারণে পরবর্তী সকল গ্রন্থকারই তাকে আখি বলে সম্বোধন করেছেন।

 

বাঙলায় প্রত্যাবর্তন

সিয়ারুল আউলিয়ালাতায়েফে আশরাফি প্রভৃতি গ্রন্থে বলা হয়েছে, শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমান তার মুর্শিদ খাজা নিজামুদ্দিনের মৃত্যুর পর আরও তিন বছর দিল্লির খানকায়ে নিজামিয়াতে অবস্থান করে ধর্মীয় জ্ঞানে বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জন ও আধ্যাত্মিক সাধনায় ব্যাপ্ত থাকেন। খাজা নিজামুদ্দিন চিশতি ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩ এপ্রিল নিজ খানকায় মৃতুবরণ করেন। সে হিসেবে বলা যায়, সিরাজুদ্দিন উসমান ১৩২৭ বা ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তার পরিবারের কাছে বাঙলার লাখনৌতিতে চলে আসেন এবং এখানেই ইসলাম প্রচারের কাজে ব্যাপৃত হন।১৩

শায়খ সিরাজুদ্দিন উসমানের দিল্লি হতে বাঙলায় চলে আসার প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক। ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন সম্রাট মুহাম্মদ বিন তুঘলক। সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি কিছু উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তার মধ্যে একটি ছিল―১৩২৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লি থেকে দেবগিরিতে স্থানান্তর করা। দেবগিরি যা পরবর্তীতে দৌলতাবাদ নামে নামকরণ করা হয়, ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় মহারাষ্ট্রের একটি শহর। দিল্লি থেকে এর দূরত্ব প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার। সম্রাট মুহাম্মদ বিন তুঘলক দিল্লির নাগরিকদের জবরদস্তির মাধ্যমে দিল্লি থেকে দেবগিরিতে স্থানান্তর হওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু রাজধানী স্থানান্তরের এমন উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাকে মেনে নিতে পারেননি অনেক নাগরিক।১৪  সিরাজুদ্দিন উসমানও ছিলেন তাদের একজন। এ কারণে তিনি দেবগিরিতে না গিয়ে নিজের পিত্রালয় বাঙলার লাখনৌতিতে চলে আসেন। লাখনৌতি থেকেই তিনি তার আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ড এবং ধর্মীয় প্রচারের কাজ শুরু করেন।

গবেষক আব্দুল মান্নান তালিব তার বাংলাদেশে ইসলাম গ্রন্থে লিখেছেন, সাদুল্লাপুর মহল্লায় নিজের আবাসস্থলের কাছে তিনি খানকাহ ও গরিবদের জন্য একটি লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তদানীন্তন বাংলার দু’টি শ্রেষ্ঠ শহর গৌড় ও পাণ্ডুয়া তার প্রধান কর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়। তার গভীর জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের কারণে ধীরে ধীরে মুসলিম-হিন্দু নির্বিশেষে সবাই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তার সংস্পর্শে এসে সাধারণ মুসলমানরা সঠিক ইসলামি জীবন-যাপনের সুযোগ পায় এবং বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে। গৌড়ের সুলতান ও সুলতান কুমারগণ তার জ্ঞান-গরিমা, ইসলামি চরিত্র ও আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তৎকালীন বাংলার স্বাধীন সুলতানদের অন্যতম শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮ খ্রি.) তার প্রধান ভক্তে পরিণত হন। তার স্থাপিত খানকাহ ব্যাপক ধর্মীয়, তমদ্দুনিক ও মানবিকতার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। তার লঙ্গরখানায় অভুক্ত, ভিখারী ও দরিদ্রদের জন্য সর্বদা খাদ্য প্রস্তুত থাকতো।১৫

ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে দাবি করা হয়েছে, বাঙলা অঞ্চলে চিশতিয়া তরিকার প্রথম সুফি ছিলেন শায়খ সিরাজুদ্দিন উসমান। তার জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে পাণ্ডুয়ার বিখ্যাত দরবেশ শায়খ আলাউদ্দিন আলাউল হক তার শিষ্যত্ব বরণ করেন। শায়খ আলাউল হক অত্যন্ত ধনী ও শাহি পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং যুবক বয়সেই ধর্মীয়ভাবে গৌড়-পাণ্ডুয়ায় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু বিত্ত ও অহম তার আধ্যাত্মিকতার পথে বাধা হতে পারেনি।

এ ব্যাপারে Proceedings of the Indian History Congress -এর প্রকাশিত জার্নালে মুহাম্মদ কামারুদ্দিন চমৎকার একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেন, …In Lakhnauti, often the procession headed by Hazrat Akhi Siraj passed through the parental house of Shaikh Alauddin. Shaikh Alauddin showed no sign of embarrassment when he passed through his house with the lighted oven of his master on his head. His relatives, however, felt much humiliated when they saw him in this fashion. Many a time he was requested by them to return to their fold. but he turned a deaf ear to their pleadings. As a result of the heat of the oven, Shai. Alauddin went bald, but he was not sorry.

হজরত আখি সিরাজ লাখনৌতিতে আগমনের পর শায়খ আলাউদ্দিন (আলাউল হক) তার আধ্যাত্মিক গরিমার সংবাদ শুনে তার মুরিদ হন এবং শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। আখি সিরাজ মানুষের মাঝে ইসলামের দাওয়াত প্রচারের লক্ষ্যে অধিকাংশ সময় গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়াতেন। এ সময় তার সঙ্গে অনেক সংখ্যক ভক্ত-মুরিদ সঙ্গী হতো। আখি সিরাজ সবসময় গরম খাবার খেতে পছন্দ করতেন বিধায় শিষ্যগণ বহনযোগ্য চুলা (অথবা খাবার গরম রাখার পাত্র) মাথায় করে নিয়ে যেত। শায়খ আলাউদ্দিন আলাউল হক তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর তিনি নিজে এই গরম পাত্র মাথায় করে বয়ে বেড়ানো শুরু করেন। অনেক সময় এমন হতো, গরম পাত্র মাথায় নিয়ে তাদের শাহি মহলের সামনে দিয়ে যেতে হতো। তার পরিবারের লোকজন তার এমন অবস্থা দেখে তার দিকে তাকিয়ে থাকতো, কিন্তু তার চোখে-মুখে সামান্যতম বিব্রতবোধ পরিলক্ষিত হতো না। পরিবারের লোকজন বহুবার তাকে আখি সিরাজুদ্দিনের শিষ্যত্ব ছেড়ে বাড়িতে এসে বিলাসী জীবনযাপনের অনুরোধ করে, কিন্তু তিনি কারো কথা কানে তুলেননি। এভাবে দীর্ঘদিন মাথায় খাবারের গরম পাত্র বহন করার ফলে আলাউল হকের মাথার চুল পড়ে যায়, তবু তিনি কখনো এব্যাপারে কোনো অভিযোগ করেননি।১৬

সুফিউইকি’তে (sufiwiki) উল্লেখ আছে, সিরাজুদ্দিন উসমান বাঙলাতেই বিয়ে করেন এবং তার এক কন্যাকে আলাউল হকের সঙ্গে বিয়ে দেন।১৭

 

গ্রন্থ প্রণয়ন এবং পরবর্তী জীবন

লাখনৌতির সাদুল্লাপুরে সিরাজুদ্দিন উসমান বাঙলা অঞ্চলের প্রথম চিশতিয়া খানকাহ নির্মাণ করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে এ অঞ্চলের ধর্মীয় প্রচার-প্রসারের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয় এটি। তবে এ খানকাহ কেবলমাত্র ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক কেন্দ্র ছিল না; বরং এখানে সমাজহিতৈষী সকল প্রকার কর্মকা- পরিচালিত হতো। হিন্দু-মুসলিম সকলের তরে নিবেদিত ছিল তার খানকাহ।১৮  তিনি তার খানকায় ধর্মীয় বই-পুস্তকের একটি পাঠাগারও প্রতিষ্ঠা করেন। ধারণা করা হয়, তিনি দিল্লি থেকে বাঙলায় আসার সময় বেশ সংখ্যক কিতাবাদি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন।

মাওলানা মুহাম্মদ হানিফ গাঙ্গোহি রচিত হালাতে মুসান্নিফিনে দরসে নিজামি গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, মাদরাসা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত আরবি শিক্ষার মাধ্যমিক স্তরের ব্যাকরণগ্রন্থ হেদায়াতুন্নাহুর লেখক শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমান। অন্য অনেক জীবনী ও গবেষণাগ্রন্থেও সিরাজুদ্দিন উসমানকে হেদায়াতুন্নাহুর লেখক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ফারসি ভাষায় লিখিত আরবি ব্যাকরণগ্রন্থ পাঞ্জেগাঞ্জ এবং প্রাথমিক আরবি ব্যাকরণগ্রন্থ মিজানুস সরফেরও লেখক বলা হয়েছে অনেক গ্রন্থে। তবে প্রাচীন কোনো গ্রন্থে এ ব্যাপারে কোনো সূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায় না।

উপমহাদেশে প্রচলিত উল্লিখিত তিনটি পাঠ্যপুস্তকে নতুন করে যেসব ভূমিকা লেখা হয়েছে, তার অধিকাংশগুলোতে এগুলোর লেখক হিসেবে শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতবর্ষের মাদরাসা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত অনেক কিতাবের মূল রচয়িতা কে ছিলেন―সেটার হদিস পাওয়া যায় না। এর কারণ, পূর্বের অনেক লেখক নিজের নাম-যশ প্রচারে একবারেই পক্ষপাতী ছিলেন না। লেখক হিসেবে তার নাম প্রচার হোক―এমন আত্মপ্রচার তারা কামনা করতেন না। বরং তারা নিজেদের যথাসম্ভব আড়ালে রাখার চেষ্টা করতেন। এ কারণে মাদারাস পাঠ্যসূচির প্রাচীন অনেক কিতাবের লেখকের নাম অজ্ঞাত রয়ে গেছে আজও। হেদায়াতুন্নাহু, মিজানুস সরফপাঞ্জেগাঞ্জ শত শত বছর ধরে উপমহাদেশের সকল ধর্মীয় বিদ্যায়তনে পঠিত হয়ে আসছে।

মুফতি আবদুল খবির এই তিনটি কিতাবের ব্যাপারে বিশদ আলোচনার পর তার গ্রন্থে লিখেছেন, আয়নায়ে হিন্দুস্তান শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমানের রচনার ব্যাপারে শেষকথা বলা যায় যে, হেদায়াতুন্নাহু গ্রন্থটি কোনো প্রকার সন্দেহ ছাড়াই তার রচনা বলে বিবেচিত। এ গ্রন্থের ব্যাপারে অন্য কোনো লেখকের নাম কোথাও উল্লেখ হয়নি। তবে মিজানুস সরফ এবং পাঞ্জেগাঞ্জ-এর ব্যাপারে অন্যান্য লেখকের নামও পাওয়া যায়।১৯

শায়খ সিরাজুদ্দিন উসমান চিশতিয়া তরিকার সুফিসাধক হওয়ার পাশাপাশি একজন ভাষাবিদ আলেমও ছিলেন, এ তথ্য আমরা আগেই জানতে পেরেছি। কিন্তু তিনি লাখনৌতিতে কোনো ধর্মীয় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কি-না, সে ব্যাপারে জানা যায় না। তবে অবস্থাদৃষ্টে ধারণা করা যায়, তিনি যে খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেখানে ধর্মীয় জ্ঞানের কোনো বিদ্যায়তনও পরিচালিত হতো। যেহেতু তিনি আরবি ও ফারসি ভাষাজ্ঞানে পণ্ডিত ছিলেন এবং তৎকালীন বাঙলার শাসকদের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক বজায় ছিল, বিধায় তার মাধ্যমে লাখনৌতি বা পাণ্ডুয়া অঞ্চলে ধর্মীয় বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় বলে ধারণা হয়।

আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে শিক্ষা গ্রহণ শেষে দিল্লি থেকে বাঙলায় আগমনের আগেই কিন্তু পূর্ববঙ্গে বিশালাকারের একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সেটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভূতপূর্ব সুফি ও মুহাদ্দিস শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তিনি ১২৮০ থেকে ১২৯০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে পূর্ববঙ্গের বর্তমান সোনারগাঁওয়ে বিরাটাকার মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে উপমহাদেশের সর্বপ্রথম হাদিসের দরস চালু করেন। সোনারগাঁও তখন বাঙলার রাজধানী না হলেও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যবন্দর হিসেবে বিবেচিত ছিল। সেহেতু বাঙলার রাজধানী হিসেবে লাখনৌতিতে যে একাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত থাকবে এ কথা বলাই বাহুল্য।

মধ্যযুগের ভারতীয় শহর গ্রন্থের লেখক অনিরুদ্ধ রায় উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবিজেতা ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি একশ বছর আগে যখন বাঙলা জয় করেন এবং লাখনৌতিকে তার রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করেন তখন এখানে একাধিক মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।২০  সে হিসেবে বলা যায়, সিরাজুদ্দিন উসমান তার ইসলাম প্রচার ও প্রসারের নিমিত্তে লাখনৌতিতে ইসলামি বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অথবা পূর্বে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যায়তনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আয়নায়ে হিন্দুস্তান শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমান রহমাতুল্লাহি আলাইহি ৭৫৮ হিজরি মোতাবেক ১৩৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাপিডিয়ার অনলাইন সংস্করণে আবদুল করিম লিখেছেন, কথিত আছে যে, শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার কাছ থেকে গৃহীত পোশাক (খেলাত) গৌড়ের সাগরদিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণায় এক স্থানে মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলেন। তার ইচ্ছানুসারে তাকে তার পোশাকের প্রোথিত স্থানের কাছে সমাহিত করা হয়েছিল। তার কবরের উপর একটি সমাধিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছিল। …সমাধিসৌধটির নির্মাণকাল জানা যায় না। কিন্তু সমাধিসৌধটির ফটকগুলিতে সংযোজিত দুটি উৎকীর্ণ লিপি প্রমাণ দেয় যে, ফটকগুলি যথাক্রমে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এবং সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। হোসেন শাহ সুফি-সাধকের দরগাহে একটি সিকায়া বা পানীয়পানের জন্য একটি ছাউনি নির্মাণ করেছিলেন। সুফি-সাধকের মৃত্যুর তারিখ ৭৫৮ হিজরি/১৩৫৭ খ্রিষ্টাব্দ বলে বর্ণিত।২১

পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার মোল্লাপাড়া-সাদুল্লাহপুরে এখনও শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমানের মাজার রয়েছে। মালদা থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মাজার। প্রতি বছর ২৩ রজব মাজারে উরস অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৬ সালে মখদুম আশরাফ মিশনের তত্ত্বাবধানে এখানে একটি হেফজ মাদরাসা পরিচালিত হয়ে আসছে।

 

পরিশিষ্ট

আয়নায়ে হিন্দুস্তান শায়খ আখি সিরাজুদ্দিন উসমান রহমাতুল্লাহি আলাইহি আমাদের বঙ্গীয় এবং ধর্মীয় ইতিহাসে প্রায় অনুল্লেখ এক চরিত্র। বঙ্গীয় ইতিহাসে তিনি আলোচিত হননি―কারণ ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিতভাবে বাঙলার ইতিহাস কখনো লেখা হয়নি। ধর্মীয় অঙ্গনে তিনি আলোচিত না হওয়ার কারণ নিতান্তই দুঃখজনক। বঙ্গীয় ধর্মীয় সমাজ আরবের ইতিহাস নিয়ে যতটা উৎসুক, নিজেদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস জানতে তাদের অনীহা ততধিক। যেসব আলেম, সুফি, দরবেশ, ইসলাম প্রচারক শত শত বছর ধরে এই বঙ্গদেশে ইসলাম প্রচারের কাজে নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছেন, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা মুসলিম বলে পরিচয় দিতে গৌরববোধ করি, তাদের ইতিহাস আমরা কখনো পাঠ করতে আগ্রহী হইনি। তাদের নামও আমাদের মসজিদ-মাদরাসা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কখনো উচ্চারিত হয় না। এ আমাদের জন্য অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।

নতুন প্রজন্ম যারা ইতিহাসের ধারা পাল্টে দেয়ার সৎসাহস রাখে, আশা করি তারা নতুন করে বাঙলার ইতিহাস রচনা করে নিজেদের দায় শোধ করবে।

প্রকাশিত : ত্রৈমাসিক পুনর্পাঠ


১. লাখনৌতি বলতে ভারতের উত্তরপ্রদেশের লখনৌ উদ্দেশ্য নয়। লাখনৌতির প্রাচীন নাম লক্ষ্মণাবতী। মুসলিম শাসনামলে লাখনৌতি নামে পরিচিতি লাভ করে। লক্ষ্মণসেনের (১১৭৮-১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ) নামানুসারে এই নামকরণ করা হয় বলে অনেকের ধারণা। রাজমহলের প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে গঙ্গার পশ্চিম তীরে গঙ্গা-মহানন্দার মিলনস্থলের নিকটবর্তী স্থানে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় এর অবস্থান। বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং নওগাঁ জেলার সীমান্তঘেঁষা প্রাচীন জনপদ এই লাখনৌতি।

২. বাংলাদেশে ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালিব, ইফাবা, পৃষ্ঠা ১২৯, প্রকাশকাল ১৯৮০

৩. সিয়ারুল আউলিয়া, সাইয়েদ মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানি, গোলাম আহমদ কর্তৃক উর্দুতে অনূদিত, লাহোর-পাকিস্তান, পৃষ্ঠা ৬, প্রকাশকাল ১৯৭৮

৪. আয়েনায়ে হিন্দ শায়খ আখি সিরাজউদ্দিন : আহওয়াল ও আসার, শায়খুল হাদিস মুফতি আবদুল খবির আশরাফি মিসবাহি, শায়খুল ইসলাম ট্রাস্ট, আহমেদাবাদ-ভারত, পৃষ্ঠা ৬১, প্রকাশকাল ২০১৮

. Proceedings of the Indian History Congress, Md. Qamaruddin, Vol. 56 (1995), Page 472

৬. আয়েনায়ে হিন্দ শায়খ আখি সিরাজউদ্দিন : আহওয়াল ও আসার, শায়খুল হাদিস মুফতি আবদুল খবির আশরাফি মিসবাহি, শায়খুল ইসলাম ট্রাস্ট, আহমেদাবাদ-ভারত, পৃষ্ঠা ১০১, প্রকাশকাল ২০১৮

৭. লাতায়েফে আশরাফি, নিজাম ইয়েমেনি, মাকতাবায়ে সিমনানি, করাচি-পাকিস্তান, পৃষ্ঠা ৩৫৫, প্রকাশকাল ১৯৮৪

৮. সিয়ারুল আউলিয়া, সাইয়েদ মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানি, গোলাম আহমদ কর্তৃক উর্দুতে অনূদিত, লাহোর-পাকিস্তান, পৃষ্ঠা ৪০৪, প্রকাশকাল ১৯৭৮

৯. মাসিক আশরাফি, সংখ্যা ১১, রবিউল আউয়াল ১৩৪৩ হিজরি, নভেম্বর ১৯২৪

১০. তারিখে দাওয়াত ও আজিমাত, সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি, লখনৌ-ভারত, খ- ৩, পৃষ্ঠা ১২৯, প্রকাশকাল ২০০২

১১. সিয়ারুল আউলিয়া, সাইয়েদ মুহাম্মদ ইবনে মুবারক কিরমানি, গোলাম আহমদ কর্তৃক উর্দুতে অনূদিত, লাহোর-পাকিস্তান, পৃষ্ঠা ৪০৪, প্রকাশকাল ১৯৭৮

১২. খাজিনাতুল আসফিয়া, মুফতি গোলাম সরওয়ার লাহোরি, লাহোর-পাকিস্তান, খ- ২, পৃষ্ঠা ২২৬, প্রকাশকাল ১৯৯৪

১৩. বাংলাদেশে ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালিব, ইফাবা, পৃষ্ঠা ১২৯, প্রকাশকাল ১৯৮০

১৪. ভারতে মুসলিম শাসনের ইতিহাস, ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল হক, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, পৃষ্ঠা ৯২, প্রকাশকাল ২০০৩

১৫. বাংলাদেশে ইসলাম, আব্দুল মান্নান তালিব, ইফাবা, পৃষ্ঠা ১২৯, প্রকাশকাল ১৯৮০

১৬. Proceedings of the Indian History Congress, Md. Qamaruddin, Vol. 56 (1995), Page 473

১৭. ইন্টারনেট লিংক :  https://www.sufiwiki.com/Akhi_Siraj

১৮. Chishti-Nizami Sufi Order of Bengal, Golam Rasool, Delhi-India, Page 83

১৯. আয়েনায়ে হিন্দ শায়খ আখি সিরাজউদ্দিন : আহওয়াল ও আসার, শায়খুল হাদিস মুফতি আবদুল খবির আশরাফি মিসবাহি, শায়খুল ইসলাম ট্রাস্ট, আহমেদাবাদ-ভারত, পৃষ্ঠা ২৩২, প্রকাশকাল ২০১৮

২০. মধ্যযুগের ভারতীয় শহর, অনিরুদ্ধ রায়, কলকাতা-ভারত, পৃষ্ঠা ১২৯, প্রকাশকাল ১৯৯৯

২১. ইন্টারনেট লিংক : http://en.banglapedia.org/index.php?title=Shaikh_Akhi_Sirajuddin_Usman_(R)


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *