বছর দুই-তিন আগে এক মাওলানা সাহেব হঠাৎই নাস্তিক হয়ে গেলেন। নাস্তিক হয়ে কলকাতা না কোথায় যেন পাড় জমালেন। বেশ উত্তেজনাকর সংবাদ ছিল সেটা। আমিও হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম, একজন মাওলানা মানুষ, যিনি মাদরাসার মুহাদ্দিস এবং মসজিদের ইমাম, তিনি কীভাবে নাস্তিক হতে পারেন?

ওই মাওলানা সাহেব তার নাস্তিক হওয়ার পথপরিক্রমা বলতে গিয়ে সিরাতের কিছু ঘটনা উল্লেখ করেন, যে ঘটনাগুলো পাঠ করে তার মনে হয়েছে, মুহাম্মদ (সা.) একজন নবী হয়ে এমন কাজ করাটা উচিত হয়নি। কিছু যুদ্ধের ঘটনা, কিছু মানবিকতার বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তুলে প্রমাণ করতে চান যে, একজন নবী-মানুষের জন্য এমন অমানবিক হওয়াটা কখনোই মেনে নেয়া যায় না। এমনই ছিল তার স্বীকারোক্তি।
যাকগে, এ ঘটনার পরই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, নবীজির সম্পূর্ণ যুদ্ধজীবন গল্পভাষ্যে বয়ান করে বইয়ে মলাটবদ্ধ করব ইনশাআল্লাহ। নিজের সঙ্গে কৃত প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে দুই বছর আগে শুধু বদর যুদ্ধ নিয়ে লিখেছি প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার ‘৩১৩’ এবং এখন উহুদ যুদ্ধ নিয়ে লিখছি ‘মৃত্যুঞ্জয়’।
এ বইগুলোতে চেষ্টা করেছি নবীজির (সা.) প্রতিটি যুদ্ধের আনুপুঙ্খিক বর্ণনা তুলে ধরতে। একেকটি যুদ্ধ কেন জরুরি হয়ে পড়েছিল, কেন রহমতের নবীকে হাতে তুলে নিতে হয়েছিল নাঙা তলোয়ার, ভালোবাসার কথা বলার জন্য যিনি প্রেরিত হয়েছিলেন সেই নবীকে কেন নিজের নিকটত্মীয়দের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে হয়েছিল, বিষয়গুলো দালিলিক গ্রন্থের সহায়তায় লিখে চলেছি। আশা করি সিরাতপাঠে কৌতূহলী মনের দোলাচল অনেকাংশে স্তিমিত করবে বইগুলো।
এ বইগুলো লিখতে গিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করতে হচ্ছে। তো, এই অধ্যয়ন পর্বে গিয়ে মনে হলো, যারা সিরাত পড়েন, সিরাত নিয়ে লিখেন বা অনুবাদ করেন, গবেষণা করেন বা সিরাতের যে কোনো ঘটনা জানতে আগ্রহী―সিরাত পাঠের সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের জন্য জরুরি হলো, সাহাবিদের জীবনী, তৎকালীন আরবের গোত্রগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা এবং এগুলোর ভৌগলিক অবস্থান, মক্কা ও মদিনার গোত্রগুলোর বংশপরম্পরা (নসবনামা) এবং উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের বংশীয় ও আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো প্রাথমিক ধারণা রাখা জরুরি।
নবীজীবনী (সিরাত) নিয়ে অল্প স্বল্প অধ্যয়নের এ পর্যায়ে এসে মনে হয়েছে, নবীজির (সা.) জীবনের ডালপালা এত বিস্তৃত এবং এর সঙ্গে মক্কা ও মদিনার মানুষদের জীবন এত ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, কেবল স্ট্রেইট নবীজির জীবনী পড়তে গেলে মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঁকি দিতে পারে। যেমনটা প্রায়ই আমাদের শিক্ষিত সমাজে দেখা যায়। কখনো কখনো তো এই উদ্ভুত প্রশ্ন অনেককে বিশ্বাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
আপনি যদি উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা না রাখেন তবে নবীজীবনী পাঠ করতে গিয়ে আচমকা থমকে যাবেন―আরে, ঘটনাটা এভাবে ঘটল কেন? কেন এ যুদ্ধটা করতে হল? অমুককে হত্যা করা কি প্রয়োজন ছিল? ওই নারীর ওপর কেন এমন অমানবিক আচরণ করা হলো? মনের মধ্যে নানা খটকার জন্ম দিতে পারে নবীজীবন সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো ঘটনা।
আপনি যদি সাধারণ একজন পাঠক হন তবে যেকোনো সিরাতই পাঠ করে যান নির্ভয়ে। তবে আপনি যদি একজন অনুসন্ধানী পাঠক হন তবে আপনাকে নবীজীবনীর পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধরাণা না রাখলেই নয়। কেননা সিরাত লেখা হয়েছে কেবলই নবীজির জীবনীকে উপজীব্য করে। সিরাতে নবীজির জীবনীই মুখ্য সঞ্চালক। এ কারণে পারিপার্শ্বিক অনেক বিষয় সিরাতে সন্নিবেশিত হয়নি। আবার দালিলিকভাবে দুর্বল এমন অনেক সূত্র ও ঘটনা উল্লেখ করেননি অনেক সিরাতলেখক। ফলে, যেভাবে আপনি একজন সাধারণ মানুষের জীবনী ধারাবাহিক বর্ণনায় পড়তে পারছেন, নবীজির জীবনী পড়তে গেলে সেই ধারাবাহিকতা না-ও পেতে পারেন।

এসব কারণে অনুসন্ধানী পাঠকের জন্য প্রয়োজন হলো নবীজীবনের পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারণা রাখা। এতে সিরাতপাঠ অনেকাংশেই সহজবোধ্য হবে বলে আশা রাখি।


Leave a Reply

Your email address will not be published.