নাকে একটা মিহি গন্ধ পাই। তিলের খাজা? নাকি গুড়-বাদামের টানা? গাঢ় হতে হতে মিলিয়ে যায়। ঠিকঠাক ধরতে পারি না। মস্তিষ্কের যে নিউরনগুলো গন্ধ নিরীক্ষণের কাজ করে, তারা খানিক ধন্দে পড়ে যায়—তাদের সংরক্ষিত ডাটাবেজ হাতড়াতে থাকে মিলিসেকেন্ডে। ততক্ষণে গন্ধটা উবে গেছে। আর ধরা যায় না। কখনো মনে হয় শুকনো সাবানের গন্ধ। গায়ের বডি স্প্রের গন্ধ কি? টের পাই না।

করোনার দিনকাল চলে যায়। জ্বর সারতে সারতে দিন কয়েক মাথার ভেতর খেলা করেছে শূন্যতা। এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করতো। শারীরিক দুর্বলতা ছিল কি ওটা? শরীর তো অত দুর্বল লাগেনি। তবে, সে কি খিদে লাগতো ও কয়দিন! দিনে চার পাঁচবার খেতে হতো। সত্যি বলছি। জ্বর ছিল মোটে তিন দিন। ওই তিন দিন আর পরের সপ্তাহখানেক, প্রচুর খিদে পেতো। এখনও খিদে লাগে। অতটা না, তবে লাগে।

কিন্তু গন্ধটা এখনও পাচ্ছি না। হালকা পাই। গোসলের সময় শ্যাম্পু বা সাবানের গন্ধটা হালকা করে, একটু পাতলা মতন হয়ে নাকে ঢুকে। ফারাক করা যায় না। বাটা মাছ ভাজা কিংবা আম্রপালি আমের গন্ধ, ফারাক করা কষ্ট হয়।

এখন শরীর অনেকটা ভালো। সারা দেশেই জ্বর-জারি ছেয়ে গেছে। কোনটা মৌসুমী জ্বর আর কোনটা করোনা, কে এসে পরখ করবে! গ্রামেও যার তার জ্বর হচ্ছে। আবার সেরেও যাচ্ছে। গ্রামে কি আর অত সাধের অসুখ নাড়ী ধরে টান দিতে পারে? গ্রামের মানুষের নাড়ী খুব শক্ত। সহজে এরা মরে না। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অন্য লেভেলের।

গ্রামে এসে কয়েকদিন মাস্ক-টাস্ক পরে থেকেছি। পরে দেখি ওটা পরলেই বরঞ্চ বিপদ, অন্যরা ভালো চোখে দেখে না। কী যন্ত্রণা! কি আর করা, যদ্দেশে যদাচার। মাস্ক খুলে রীতিমতো মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ছি। ভাই-বেরাদরদের সঙ্গে আসতে-যেতে গালগপ্পো চলছে। কাল তো জুমার নামাজও পড়ালাম। মাস্ক পরে জুমার নামাজ পড়াতে গেলে সবাই দুয়ো দিতে দিতে সঙ্গেসার করে ফেলত না! দুই চাচাতো ভাইও নানা মাত্রিক জ্বর থেকে সেরে উঠি উঠি করছে। তাদেরও সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই। মসজিদ থেকে গলাগলি ধরে বাড়ি ফেরা।

সে কি বৃষ্টি এ কয়দিন! সারাদিন সুয্যিমামার দেখা নেই। জমিদারি দেখতে যাওয়া হচ্ছে না। পুকুরপাড়ে ইয়া বড় বড় ঘাস আর লতা হয়েছে। সেগুলো কাটতে হবে। বেগুন গাছ আছে কিছু, ঘাসের তোড়ের নিচে কুপোকাত প্রায়। পেয়ারা ক্ষেতে সার দিতে হবে। কিন্তু এখন সার দিলে বৃষ্টিতে ধুয়ে যাবে না সব! তাই দেয়া যাচ্ছে না। বাহির বাড়িতে নানা প্রকার গাছ-গাছালি, সেগুলোর চারপাশেও আগাছার দঙ্গল। বৃষ্টি হলে এমন বাড় বাড়ন্ত হয়! একটু সূর্য উঠলে একে একে সব কাটাছেঁড়া করতে হবে।

তবুও তো দিন চলে যায়। নরম মেঘ থেকে বৃষ্টি হলেও সন্ধ্যা নামে। রাতের বেলা কামরাঙ্গা গাছটায় শুনতে পাই বকের ক্রন্দন। বাসা ভিজে গেলে ছানাদের কষ্ট হয়। ডানা দিয়ে ঢেকে রাখে। মা পাখিটা পেটের উষ্ণতায় তা দেয় ছানার শরীরে। পাতার গায়ে ফোঁটা পড়ে ছলকে চলে যায় আরেক পাতায়। তারপর আরেক পাতায়। ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ে গিয়ে মাটির শরীরে। ঢল যায় বাড়ির উঠোন থেকে রাস্তায়। তারপর বিলে চলে যায় আকাশের জল। তারপর জলেরা কোথায় যায়?

জলেরা কোথাও যায় না কখনো। অযুত সহস্র কাল ধরে বৃষ্টি আর মাটির সঙ্গে চলছে যোজনা। একজন আরেকজনের বুকে তুলে দেয় জলের জীবন। ফোঁটা হয়ে জমিনে পড়ে বলেই ফলে শষ্য, ফুটে ফুল, মিটাই তৃষ্ণা। মাটি থেকে বাষ্প হয়ে আবার চলে যায় মেঘের দেশে। আবার কোথাও গিয়ে ঝরছে বৃষ্টি। আশ্চর্য এক প্রকৌশল চলছে দুনিয়াজুড়ে।

তারপর বলো, তোমরা প্রভুর কোন কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *