আমার মনে হয়, কেবল ইসলামি প্রকাশনাশিল্পে প্রকাশকদের দোষ দেয়াটা অবিবেচক কাজ হবে। এই লেখক নিজে যেহেতু বাংলাবাজারকেন্দ্রিক একটি স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, গত পাঁচ-ছয় বছর বাংলাবাজার বইপট্টির গলি-ঘুঁপচি সকাল-বিকাল গাশত করে বুঝেছি—মৌলিক লেখার সংকটে প্রকাশকের দোষ অতটা নয় যতটা আমরা বাইরে থেকে মনে করি। মৌলিক বইয়ের সংকটের পেছনে জড়িয়ে আছে ধর্মীয়, পরিবেশগত, সামাজিক নানাবিধ বিপত্তি, যেগুলোর অনেকটা লেখকের ওপর বর্তায়, আবার কিছু কারণ পরিবেশগত কারণে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সুতরাং এই সংকট বয়ানে কেবলই প্রকাশককে বলির পাঁঠা বানানো নিতান্ত অজ্ঞতাপ্রসূত।

 

পরমুখাপেক্ষী কুলুর বলদ

আমি তবে গোড়া থেকেই শুরু করি। একেবারে আমাদের আকাবির-আসলাফদের পদাঙ্কে পা রেখে রেখে। যারা আমাদের মনের মধ্যে এই এহসাস পয়দা হতে সাহায্য করেছে যে—আমরা বাঙালিরা জবরদস্ত আহম্মক এক সম্প্রদায়। ধনে, মনে, ধর্মে, জ্ঞানে আমরা অপরাপর মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে খানিকটা নীচ, অতটা কুলীন নই। আরব তো বটেই, হিন্দুস্তান-পাকিস্তানের মুসলিমদের থেকে আমাদের তবকা বেশ তলানীর দিকে, আশরাফ নয় আতরাফ মুসলিম। ধর্মীয় এবং জ্ঞানগত বিষয়াদিতে আরব-হিন্দুস্তানের মুখাপেক্ষিতা তাই আমাদের জরুর কর্তব্য।

তো এই পরমুখাপেক্ষিতার ফলস্বরূপ আমাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেছে, আরবের শায়খ ইতিহাস বিষয়ে যে বইটি লিখলেন সেটি নিঃসন্দেহে আলা দরজার। পাকিস্তানের যে মৌলানা ঐতিহাসিক উপন্যাসের পুস্তকটি রচনা করলেন সেটি আলবৎ উন্নত জ্ঞান-গরিমায় রচিত। তো, আমি বলি কি, তাহলে আসুন আমরাও এ বিষয়ে বাংলাভাষায় একখানা গ্রন্থ রচনা করি।

এখানে এসেই মূলত ধরা খেয়ে যাই আমরা। আমাদের মনে তখন পরমুখাপেক্ষিতার সোরাহি টইটম্বুর হয়ে ভরে উঠে। কেন নতুন করে বাংলায় আরেকখানা গ্রন্থ রচনা করতে হবে? এ বিষয়ে আরবের অমুখ শায়খ লিখেছেন তো! হিন্দুস্তান-পাকিস্তানের মৌলানা ‘বেহদ আচ্ছা কাম কিয়া’। চলো, আমরা সেগুলো অনুবাদ করি। ভুলে গেলে চলবে না যে আমরা জন্মগতভাবেই পরমুখাপেক্ষী চিন্তা-চেতনা নিয়ে বেড়ে উঠছি। সুতরাং আমাদের মৌলিক টৌলিকের জুজু দেখিয়ে লাভ নেই।

এক আরবীয় লেখক ইদানীং ইসলামি পুস্তক বাজারে বেশ রমরমা চলছে। তিনি রচিত বহুসংখ্যক আরবি বই ইতোমধ্যে বঙ্গানুবাদ হয়ে প্রকাশ হয়েছে। এই আরবীয় লেখকের অনূদিত দু-একটি বইয়ে নজর দেয়ার সুযোগ হয়েছিল। কী আছে তার বইয়ে? নাথিং স্পেশাল, নাথিং নিউ। জীবনী বা ইতিহাস বিষয়ক তাঁর বইগুলোকে স্রেফ বৃহৎ আকারের উইকিপিডিয়া বলা যায়। কেবল গটগটে তথ্য আর ঘটনার ধারাবর্ণনা, ক্লান্তিকর। বইয়ের মধ্যে নতুন কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই, নতুন কোনো চিন্তা নেই। এ যদি আমি জহিরউদ্দীন বাবরকে বলি, ‘ভাই, এই এই বিষয়ে আমাকে মৌলিক বই লিখে দিতে হবে।’ বাবর ভাই এক বছরে ইতিহাসের তিনটা মৌলিক বই লিখে উপহার দিতে পারবেন।

শুধু বাবর ভাই নন, এমন আরও একশ জনের নাম বলতে পারব যারা এই আরবীয় শায়খের বইয়ের চেয়ে প্রাঞ্জল ও তথ্যবহুল মৌলিক বই লিখতে পারবেন বাংলায়। কিন্তু তিনি যে আরবীয় শায়খ! এখানেই তো জন্মের মতো মার খেয়ে যায় জহিরউদ্দীন বাবর আর আবদুল্লাহ আল মাসূমরা।

এ দায়ভার লেখক-প্রকাশক উভয়ের। দুজনকেই উদ্যোগী হতে হবে মৌলিক রচনার প্রতি। সম্প্রতি এক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘ইতিহাস বিশ্বকোষ’ নামে ১০ খণ্ডে মুসলিম বিশ্বের ইতিাহসগ্রন্থ প্রকাশ করল। পাকিস্তানি এক লেখকের বইয়ের অনুবাদ। আপনার কি মনে হয়, এ বই লেখার যোগ্যতা বাঙালি লেখকদের ছিল না? আমাকে বলুন, যেসব অনুবাদক এ গ্রন্থ এক বছর লাগিয়ে অনুবাদ করেছেন, তাদের দিয়ে একই সময়ের মধ্যে ১০ খণ্ডের মৌলিক ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করে দেখাব। শুধু প্রকাশকের সৎসাহস দরকার, আর ওই লেখকের মনে নিজেকে চেনার তাগিদ দরকার, যার মৌলিক লেখার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনুবাদ করে লেখক হিসেবে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছে।

(চলবে)


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *